
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার শিমুলিয়া–গজারিয়া দুই কিলোমিটার খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে শ্রমিকের পরিবর্তে এক্সকাভেটর (ভেকু) ব্যবহার, শ্রমিক তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ, খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ না করা, প্রকল্পের তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড না পাওয়া এবং খননকৃত মাটি সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন তথ্য ও সাক্ষ্য মিলেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব অভিযোগের বেশিরভাগই অস্বীকার করেছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশেষ অনুদান কর্মসূচির আওতায় শিমুলিয়া–গজারিয়া দুই কিলোমিটার খাল খনন ও বৃক্ষরোপণের জন্য ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
প্রকল্পের সভাপতি ছিলেন নদনা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আজগর হোসেন সোহেল। প্রকল্প তদারকি কমিটির সভাপতি ছিলেন সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাছরিন আকতার। প্রকল্পের সার্বিক বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়।
বরাদ্দের মধ্যে ১১৯ জন শ্রমিকের মজুরি বাবদ ২৫ লাখ ৫৭ হাজার ৭৪০ টাকা এবং লেবার সর্দারের ভাতা বাবদ ৪ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া ডিজিটাল সার্ভে, লেভেলিং, অস্থায়ী পাইলিং, কোদাল-ঝুড়ি ক্রয়, সাইনবোর্ড, সীমানা খুঁটি, তদারকি ও প্রশাসনিক ব্যয়সহ অন্যান্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয় ২৫ লাখ ৯১ হাজার ৯৫৫ টাকা।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সরকারি নির্দেশনায় স্থানীয় অতিদরিদ্র উপকারভোগীদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগের কথা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া বরাদ্দকৃত অর্থ নির্ধারিত খাত ছাড়া অন্যত্র ব্যয় করা যাবে না বলেও নির্দেশনায় বলা হয়েছে।
শ্রমিকের বদলে ভেকু ব্যবহারের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দা, শ্রমিক তালিকাভুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি এবং প্রতিবেদকের সংগ্রহ করা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, প্রকল্পের অন্তত একটি বড় অংশে এক্সকাভেটর (ভেকু) ব্যবহার করে খাল খনন করা হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক ও যন্ত্র—উভয়ই ব্যবহার করা হয়েছে।
ব্যাংক হিসাব খোলার অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা যায়, নদনা ইউনিয়নের কালুয়াই, বোরপিটসহ কয়েকটি গ্রামের বহু নারীর জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি ব্যবহার করে সোনাইমুড়ী সোনালী ব্যাংক পিএলসি শাখায় ব্যাংক হিসাব খোলা হয়।
ওই নারীদের কয়েকজনের দাবি, তাঁদের জানানো হয়েছিল সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। হিসাব খোলার পর তাঁদের কাছ থেকে কয়েকটি ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁদের হিসাবে ২১ হাজার ৫০০ টাকা জমা হয়েছে এবং পরদিন একই পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
বোরপিট গ্রামের শাহেদা আক্তার বলেন, হিসাব খোলার পর চেকবই দেওয়ার দিন তাঁদের উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে কয়েকটি চেক পাতায় স্বাক্ষর নেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, তিনি কোদাল-ঝুড়ি হাতে ছবি তুলতে রাজি হননি।
একই গ্রামের বিউটি আক্তারের দাবি, তিনি খাল খননের কোনো কাজ করেননি। পরে মোবাইলে অর্থ জমা ও উত্তোলনের এসএমএস পান। বিষয়টি জানালে স্থানীয় এক ব্যক্তি তাঁকে দুই হাজার টাকা দেন।
মন্নান মাস্টার বাড়ির তাছলিমা আক্তার ও আইরিন সুলতানা জানান, তাঁরা নিজেরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে আনার পর সন্ধ্যায় কয়েকজন ব্যক্তি তাঁদের বাড়িতে গিয়ে মাথাপিছু পাঁচ হাজার টাকা রেখে বাকি অর্থ নিয়ে যান বলে তাঁদের অভিযোগ।
এ বিষয়ে ২ নম্বর নদনা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি ওই দিন একটি “সমস্যা সমাধানের” জন্য সেখানে গিয়েছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সোলেমান বলেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক কর্মীর অনুরোধে তিনি গ্রামের কয়েকজনকে হিসাব খুলতে নিয়ে যান। তবে তাঁর দাবি, তাঁদের কেউ খাল খননের কাজ করেননি।
প্রকল্প সভাপতির বক্তব্য
প্রকল্প সভাপতি আজগর হোসেন সোহেল বলেন, প্রকল্পে ১১৯ জন শ্রমিকের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি নিজে ২৯ জনের নাম দেন। তাঁর ভাষ্য, শ্রমিকের পরিবর্তে ভেকু দিয়ে কাজ করা হয়েছে এবং পরে শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে মাথাপিছু পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে যা দেখা গেছে
প্রতিবেদকের সরেজমিন পরিদর্শনে খালের কোথাও প্রকল্পের তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। ভেকু দিয়ে খননের কারণে কয়েকটি স্থানে খালের পাড় খাড়া হয়ে গেছে এবং কোথাও কোথাও মাটি ধসে পড়েছে। প্রকল্পে বৃক্ষরোপণের জন্য বরাদ্দ থাকলেও খালের দুই পাড়ে নতুন বৃক্ষরোপণের সুস্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, খনন করা মাটি ট্রাকে করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
খালসংলগ্ন বাসিন্দা খোরশেদ আলমের অভিযোগ, খালের সামনের মাটি পাওয়ার জন্য তাঁকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাবেক উচ্চমান সহকারী আব্দুল মতিন। তাঁর দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর মো. আল মামুন এবং কর্মসহকারী আব্দুল কুদ্দুস প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে প্রতিবেদকের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। তাঁদের বক্তব্যের অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেশকাতুর রহমান প্রথমে বলেন, প্রকল্পের সাইনবোর্ড ছিল, পরে তা চুরি হয়ে যায়। তিনি দাবি করেন, ১১৯ জন শ্রমিক কাজ করেছেন এবং সবাই মজুরি পেয়েছেন।
বৃক্ষরোপণের বিষয়ে তিনি বলেন, গাছের চারা ছোট হওয়ায় প্রতিবেদকের চোখে নাও পড়ে থাকতে পারে। পরে শ্রমিক সংকটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে নির্ধারিত মজুরিতে শ্রমিক পাওয়া কঠিন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প তদারকি কমিটির সভাপতি নাছরিন আকতার বলেন, “সব শ্রমিক তাদের টাকা পেয়েছেন। শ্রমিক দিয়েই কাজ করা হয়েছে।”
প্রতিবেদক ভেকু ব্যবহারের ভিডিও ফুটেজের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী কোথাও যন্ত্র, কোথাও শ্রমিক ব্যবহার করা হয়েছে। মাটি সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান।
নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা জেলা সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিবেদকের হাতে যা রয়েছে
এই প্রতিবেদনের তথ্য যাচাইয়ে প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে প্রকল্পের বরাদ্দপত্র, শ্রমিক তালিকার অংশ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত তথ্য, মোবাইল এসএমএসের কপি, সরেজমিনে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র এবং একাধিক সাক্ষাৎকারের অডিও রেকর্ড। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এবং যাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেছে, তা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
