মজুত থাকলেও সংকট, সয়াবিন সিন্ডিকেটের ফাঁদে ভোক্তা


চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের এক ডিলার ফোন পেলেন কোম্পানির প্রতিনিধির কাছ থেকে। বার্তাটা সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্পষ্ট- সরকার দাম না বাড়ালে ডিলার পর্যায়ে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হবে। ডিলার বুঝলেন, এবার আবার সেই পুরনো খেলা শুরু হতে চলেছে। সরবরাহ কমলে বাজারে সংকট তৈরি হবে, দাম বাড়বে, ভোক্তা জিম্মি হবে, সরকার চাপে পড়বে। এই চক্রটা বছরের পর বছর ধরে একইভাবে চলছে।

মজুত আছে, তবু সংকট তৈরির ষড়যন্ত্র

পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুত থাকার পরেও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট মিলপর্যায়ে সরবরাহ কমানোর তোড়জোড় শুরু করেছে। লক্ষ্য একটাই- সয়াবিন তেলের দাম লিটারে আট থেকে সর্বোচ্চ ১৩ টাকা বাড়ানোর জন্য সরকারকে চাপে ফেলা।

এরই মধ্যে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন গত ১১ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছে। প্রস্তাবে বোতলজাত সয়াবিন লিটারে ১০ টাকা বাড়িয়ে ২০৯ টাকা, খোলা সয়াবিন আট টাকা বাড়িয়ে ১৮৮ টাকা এবং খোলা পাম তেল ১৩ টাকা বাড়িয়ে ১৮৩ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। দাম না বাড়ালে লোকসান এড়ানো সম্ভব নয় বলে তারা জানিয়েছে।

কিন্তু সরকার এখনো দাম না বাড়ালেও বাস্তবতা ভিন্ন। খুচরা পর্যায়ে খোলা সয়াবিনের দাম মাসের ব্যবধানে লিটারে ছয় টাকা বেড়ে ১৯৮ টাকায় পৌঁছেছে- যা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১৮ টাকা বেশি। সিন্ডিকেট সরকারের অনুমতির অপেক্ষা না করেই নিজেরাই দাম বাড়িয়ে নিয়েছে।

চার থেকে পাঁচটি কোম্পানির হাতে বাজারের ৯০ শতাংশ

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, দেশের চার থেকে পাঁচটি বড় কোম্পানি সয়াবিন তেলের বাজারের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই কোম্পানিগুলো চাহিদামতো তেল আমদানি করে, রিফাইন করে বাজারে ছাড়ে। বাড়তি মুনাফার জন্য ডিলারদের মাধ্যমে সরবরাহ কমিয়ে দেয়, সরকারকে চাপে ফেলে এবং ভোক্তাকে জিম্মি করে মূল্য বাড়িয়ে নেয়। বিগত কয়েক বছর ধরে একই পন্থায় এই চক্রটি মূল্য বাড়িয়ে আসছে।

টিকে গ্রুপ জানিয়েছে, আমদানি পর্যায়ে খরচ এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। লিটারে ১৮ থেকে ২০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে তাদের দাবি। বিশ্ববাজারেও অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম এক বছরে টনপ্রতি এক হাজার ৭৮ থেকে বেড়ে এক হাজার ১৯১ ডলার হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে সেই চাপ পুরোটা কি সাধারণ ভোক্তার ঘাড়েই চাপাতে হবে? বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, কর ছাড়ের বিষয়গুলো সমন্বয় করে নতুন দাম নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কিন্তু সেই সমন্বয় কবে হবে, তার উত্তর নেই।

এপ্রিলেও একই ঘটনা ঘটেছিল। মিল মালিকরা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিলে সিন্ডিকেট সরবরাহ কমিয়ে দেয়। খোলা সয়াবিনের দাম লিটারে ৩৪ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। তখন সরকারকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ২৯ এপ্রিল দাম বাড়ানো হয়েছিল।

এখন সেই একই নাটক আবার মঞ্চস্থ হচ্ছে। ডিলাররা জানছেন সরবরাহ কমবে, বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে, দাম বাড়ছে। সাধারণ মানুষ, যার রান্নাঘরে প্রতিদিন তেল লাগে, সে শুধু দেখছেন- আজ কত, কাল কত। সিন্ডিকেটের এই খেলা থামাতে না পারলে সয়াবিনের বোতলের মুখ খুলতে গিয়ে প্রতিদিন একটু বেশি পকেট খালি হবে সাধারণ ভোক্তার।