এনেস্থেসিয়া দেওয়ার পর রোগীর মৃত্যু, চার লাখ টাকায় সমঝোতার অভিযোগ


নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে গলার টনসিল অস্ত্রোপচারের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর মো. পারভেজ (৪৫) নামের এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের আগে এনেস্থেসিয়া দেওয়ার পরই তার অবস্থার অবনতি হয়। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চার লাখ টাকার সমঝোতা হয়েছে বলেও দাবি করেছে পরিবার।

গত শুক্রবার রাতে উপজেলার জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। নিহত পারভেজ উপজেলার দেওটি ইউনিয়নের আন্দিরপাড় এলাকার বাবুল মিয়ার ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন কাতারে গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

তবে রোগীর মৃত্যুর কারণ কী, চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না- তা এখনো তদন্তে নিশ্চিত হয়নি। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

অস্ত্রোপচারের আগেই মৃত্যু

নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, শুক্রবার বিকেলে গলার টনসিল অস্ত্রোপচারের জন্য পারভেজকে জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাত ১০টার দিকে তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, অস্ত্রোপচার শুরু হওয়ার আগেই রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাকে মৃত অবস্থায় বের করে আনা হয়।

পারভেজের বাবা বাবুল মিয়া বলেন, “ওটিতে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর একজন চিকিৎসক বের হয়ে যান। পরে এনেস্থেসিয়া দেওয়া চিকিৎসকও বের হন। কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের কর্মীদের দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়। পরে জানানো হয়, রোগীকে আইসিইউতে নিতে হবে।”

তিনি বলেন, “ওটি থেকে বের করার সময় ছেলের শরীর ঠান্ডা ছিল। পরে ইসিজি করে মৃত্যুর বিষয়টি জানানো হয়।”

চার লাখ টাকা নেওয়ার দাবি

নিহতের বাবা জানান, ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তরের পর স্থানীয় কয়েকজনের পরামর্শে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা হয়। পরে রোববার সন্ধ্যায় হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফখরুল ইসলাম লিটনের কাছ থেকে চার লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালের পক্ষ থেকেও অর্থ লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। তবে কেন টাকা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালের চিকিৎসক সহকারী আব্দুল মোতালেব বলেন, “রোগীকে ওটি রুমে নেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে কিছু ইনজেকশন দেওয়া হয়। এরপর রোগীর শরীর ঘামতে থাকে এবং অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। কিছু সময়ের মধ্যে রোগী মারা যান।”

তিনি বলেন, “কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা চিকিৎসকের বিষয়।”

এনেস্থেসিয়া নিয়ে প্রশ্ন

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সময় অপারেশন থিয়েটারে ওটি বয় হিসেবে ছিলেন রাকিব ও রুবিনা আক্তার। সার্জন হিসেবে ছিলেন চিকিৎসক কিশোর কুমার হালদার। এনেস্থেসিয়া দেন হাসপাতালের গাইনী চিকিৎসক ও সনোলজিস্ট ডা. ফারজানা আক্তার রুমা।

হাসপাতালের প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, ডা. ফারজানা আক্তার গাইনী, প্রসূতি রোগ ও সনোলজি বিষয়ে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, এনেস্থেসিয়া প্রয়োগ একটি বিশেষায়িত চিকিৎসা কার্যক্রম, যা সাধারণত এনেস্থেসিওলজিস্ট বা অবশকারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তবে ওই চিকিৎসক এনেস্থেসিয়া দেওয়ার জন্য কী ধরনের প্রশিক্ষণ বা অনুমোদনপ্রাপ্ত, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে ডা. ফারজানা আক্তার রুমার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও তার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেয়নি।

তদন্ত কমিটি

ঘটনার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হলে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তারা হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রিয়াজ উদ্দিন রাশেদ বলেন, “ঘটনার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে সিভিল সার্জনের নির্দেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে।”

কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইসরাত জাহানকে।

সোনাইমুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন বলেন, “এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়নি। আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি আমার জানা নেই।”

আগেও অভিযোগ ছিল

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতাল আগে মেডিকেয়ার হসপিটাল নামে পরিচালিত হতো। ওই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এর আগেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। এক্স-রে করার সময় যন্ত্র পড়ে রোগী আহত হওয়ার ঘটনাও এলাকায় আলোচনায় এসেছিল।