
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গন্ডামারার নুরুল ইসলামের কাছে খবরটা এলো অনেক দেরিতে। কর্ণফুলী নদীতে বস্তাবন্দী একটি লাশ উঠেছে- এই খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ পরিচয় জানতে ছবি ও তথ্য প্রচার করছে। দশটি দিন কেটে গেল। তারপর একদিন বুক কাঁপতে কাঁপতে সদরঘাট নৌ থানায় ছুটে এলেন সেই বাবা।
মেয়ের পায়ের জুতা। কানের দুল। গায়ের পোশাক।
চেনা জিনিসগুলো দেখতেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। নিশ্চিত হলেন- নিথর দেহটি তাঁরই মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস।
জান্নাতুল ফেরদৌসের জীবনটা সহজ ছিল না। বাঁশখালীর গন্ডামারা থেকে শহরে এসেছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে। চান্দগাঁওয়ের ছোট্ট ভাড়া বাসায় একা থেকে কারখানায় কাজ করতেন। স্বপ্ন ছিল সুন্দর একটা জীবনের। পরিবারের কাছ থেকে দূরে থেকেও টিকে থাকার চেষ্টা করেছিলেন নিজের মতো করে।
পরিবারের অমতে বিয়ে, তারপর অশান্তি
২৮ বছরের জান্নাতুল চান্দগাঁওয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন, চাকরি করতেন একটি জুতার কারখানায়। পোশাক কারখানায় কাজ করার সুবাদে এক যুবকের সঙ্গে পরিচয়, তারপর ভালোবাসা। পরিবারের মত না নিয়েই দ্বিতীয় বিয়েতে জড়িয়ে পড়লেন। পরিবার মেনে নেয়নি।
কিন্তু বিয়ের পর সুখের বদলে নেমে এলো ঝড়। দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র ঝগড়া-বিবাদ। পরিবারের আশঙ্কা, সেই বিবাদই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল জান্নাতুলের প্রাণ। হত্যা মামলায় সন্দেহের তীর এখন সেই দ্বিতীয় স্বামীর দিকেই।
১ আগস্ট কর্ণফুলী নদীর পিডিবি ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হয় গলিত বস্তাবন্দী লাশটি। দশ দিন ধরে লাশটি পড়ে ছিল অজ্ঞাত হয়ে। গলে গিয়েছিল চেহারা। কে এই মেয়ে, কোথায় তার বাড়ি- কেউ জানত না। পুলিশ ছবি ছড়িয়ে দিল সামাজিক মাধ্যমে। অপেক্ষা করল কেউ এসে চিনে নেবে বলে। অবশেষে সেই বাবা এলেন। জুতা, দুল, পোশাক- এই তিনটি জিনিসই হয়ে উঠল মেয়েকে চেনার শেষ উপায়।
সোমবার (১০ আগস্ট) রাতে সদরঘাট নৌ থানার ওসি আবদুর রউফ নিশ্চিত করেন, লাশটি জান্নাতুল ফেরদৌসের।
ওসি জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে বিভিন্ন এলাকায় চিরুনি অভিযান চলছে। গ্রেপ্তারের পর হত্যার আসল রহস্য উন্মোচন হবে।
যে মানুষটির হাত ধরে সুখের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই হাতেই কি শেষ হলো জান্নাতুলের জীবন? উত্তর এখনো পুলিশের কাছে। তদন্ত চলছে, অভিযান চলছে। কিন্তু গন্ডামারার সেই বাবার বুকে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটার কোনো উত্তর নেই। যে মেয়ে স্বপ্ন নিয়ে শহরে এসেছিল, সহকর্মীদের সঙ্গে হেসে কাজ করত, একটু ভালো থাকার চেষ্টা করত- সে আজ আর নেই। একটি বস্তা, একটি নদী আর দশ দিনের অপেক্ষা- এটুকুই হলো তার শেষ গল্প।
