বিদ্যুৎ বাঁচাতে গ্যাস কমছে শিল্পে, তীব্র হচ্ছে দুই খাতের সংকট


দেশজুড়ে তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ সংকট আরও প্রকট হয়েছে। অনেক এলাকায় দিনে-রাতে মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টায় মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও লোডশেডিং পৌঁছেছে ১৮ ঘণ্টায়। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়ছে ক্ষোভ।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় ৩ থেকে ৪ হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বুধবার পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে খারাপ। অনেক কারখানা দিনে কয়েক ঘণ্টার বেশি চালানো সম্ভব হয়নি। গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, আশুলিয়া, নরসিংদী ও হবিগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।

বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ময়মনসিংহ বিভাগের কিছু এলাকায় ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও খুলনায় সাত ঘণ্টার বেশি এবং কুমিল্লায় ছয় ঘণ্টার বেশি লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।

জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেখানে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ৬০ শতাংশের বেশি। ময়মনসিংহ-১ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কোনো কোনো এলাকায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

নাশকতার আশঙ্কায় সতর্ক প্রশাসন

বিদ্যুৎ সংকটকে কেন্দ্র করে কোথাও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে- এমন আশঙ্কায় দেশের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাওসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়ভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচিও হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।

নেত্রকোনা ও নাটোরের বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে জানিয়েছেন, তাদের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। কোথাও কোথাও ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

এলএনজি সরবরাহ কমেছে

জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়া।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে সৌদি আরামকোর এলএনজিবাহী কার্গো সামিটের ভাসমান টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়নি। অন্যদিকে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালও একটি বয়লার দিয়ে সীমিত আকারে সরবরাহ চালু রেখেছে।

মঙ্গলবার এই দুটি টার্মিনাল থেকে প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বুধবার জাতীয় গ্রিডে এসেছে ৪৮ কোটি ঘনফুট। কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা নিশ্চিত নয়।

শিল্পে গ্যাস কমিয়ে বিদ্যুতে বাড়তি বরাদ্দ

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বুধবার থেকে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিদিন ৭০ কোটি ঘনফুটের কম গ্যাস দেওয়া হলেও এখন তা বাড়িয়ে প্রায় ৯০ কোটি ঘনফুট করা হয়েছে।

এর বিপরীতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমেছে ২০ থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট।

তিতাস, বাখরাবাদ ও কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে গিয়ে শিল্পকারখানায় সংকট তৈরি হয়েছে।

তিতাসের একজন কর্মকর্তা জানান, শুধু তিতাসের আওতাধীন এলাকায় প্রায় সাড়ে চার হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে বুধবার তিন হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান গ্যাস সংকটে স্বাভাবিক উৎপাদন করতে পারেনি।

‘আগে বিদ্যুৎ, পরে অন্য খাত’

জ্বালানি খাতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতে আগে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এরপর অন্য খাতের বিষয় দেখা হবে।

তিনি অভিযোগ করেন, জ্বালানি খাতের কিছু কর্মকর্তার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে এবং দ্রুত সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।

ডিজেলচালিত কেন্দ্র চালু, তবুও সংকট কাটছে না

বিদ্যুৎ ঘাটতি কমাতে সৈয়দপুর ও খুলনার ডিজেলচালিত দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি মেঘনাঘাটের ৭০০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্রও চালু হয়েছে।

তবে যান্ত্রিক সমস্যায় চাঁদপুর ও সিলেটের দুটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে বরাদ্দ পাওয়া ৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। সব গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র চালু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, টানা বৃষ্টি না হলে এবং এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে দ্রুত বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।