
চোখে পানি, গলায় কান্না চাপা এক আকুতি। লোহাগাড়া উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যালয়ে সাধারণ সম্পাদক এস এম চিশতীর সামনে দাঁড়িয়ে ছেলেটি বলল, “ভাইয়া, আপনি চাইলে আমি আবার মাঠে ফিরতে পারবো। আমি ফুটবল ছাড়া থাকতে পারছি না।” একসময় যে পায়ের গতিতে প্রতিপক্ষের রক্ষণ কাঁপত, সেই পা এখন মাঠের বাইরে বসে থাকার অভ্যাসে জর্জরিত। ছেলেটির নাম রবিউল ইসলাম- চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার এক সময়ের উদীয়মান ফুটবল প্রতিভা, যার স্বপ্ন আজ থমকে আছে একটা ইনজুরির কাছে।
মাঠ কাঁপানো ছেলেটি হয়ে উঠেছিলেন প্রতিভার প্রতীক
দুর্দান্ত গতি, নিখুঁত বল নিয়ন্ত্রণ আর খেলার প্রতি অসীম নিবেদন- এই তিনে মিলেই অল্প বয়সে লোহাগাড়ার ক্রীড়াঙ্গনে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন রবিউল। মাঠে নামলেই তার পায়ে বল যেন কথা বলত। স্থানীয়দের চোখে তিনি ছিলেন আগামী দিনের তারকা, যাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল অনেক প্রত্যাশা। সেই প্রতিভার স্বীকৃতিও এসেছিল দ্রুত- জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৭ দলের অনুশীলনে ডাক পান তিনি। কিন্তু নিয়তি হয়তো অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। সেই অনুশীলনেই গুরুতর চোট পান রবিউল, আর সেখান থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ, নিঃসঙ্গ অপেক্ষার গল্প।
এক বছরের নিঃসঙ্গতায় ভেঙে পড়া এক তরুণ
প্রায় এক বছর হতে চলল, মাঠের বাইরে রবিউল। যে সতীর্থদের সঙ্গে একসময় একই মাঠে দৌড়াতেন, তারা এখন খেলছে, জিতছে, এগিয়ে যাচ্ছে। আর রবিউল দাঁড়িয়ে থাকেন দূরে, দর্শকের ভূমিকায়। “সতীর্থরা যখন মাঠে খেলছে, তখন আমি শুধু দূর থেকে তাদের খেলা দেখি। এটা আমার জন্য খুব কষ্টের,” নিজের যন্ত্রণার কথা এভাবেই বলেন তিনি। চিকিৎসার অভাবে দিনের পর দিন পার হয়েছে, কিন্তু মাঠে ফেরার পথ খোলেনি। শারীরিক এই বিচ্ছিন্নতা ধীরে ধীরে তার মনেও ছাপ ফেলেছে- একসময়ের চঞ্চল, প্রাণবন্ত ছেলেটি আজ হতাশায় নুয়ে পড়া এক তরুণ। তবু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা এতটুকু কমেনি।
“ছোটবেলা থেকেই ফুটবল আমার স্বপ্ন। ফুটবল খেলেই নিজেকে একজন ভালো খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলাম,” বলেন রবিউল, “আমি আবার মাঠে ফিরতে চাই। ফুটবল ছাড়া থাকতে আমার খুব কষ্ট হয়।”
রবিউলের চোখের পানি আর মাঠে ফেরার সেই আকুতি নাড়া দিয়েছে লোহাগাড়ার ক্রীড়াঙ্গনকে। উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস এম চিশতী দিয়েছেন সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস। তিনি বলেন, “রবিউলের স্বপ্ন থেমে যাক, এটা আমি চাই না। তার চোখের পানি ও ফুটবলে ফেরার আকুতি আমাকে সত্যিই নাড়া দিয়েছে। তার অপারেশন ও চিকিৎসার বিষয়টি নিয়ে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। কতটুকু করতে পারবো জানি না, তবে চেষ্টা ও সহযোগিতার কোনো কমতি থাকবে না, ইনশাআল্লাহ।”
আশার কথা শুনিয়েছেন লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বায়েজিদ বিন আখন্দও। তিনি বলেন, “রবিউল একজন সম্ভাবনাময় তরুণ ফুটবলার। ইনজুরির কারণে তার খেলোয়াড়ি জীবন থমকে যাক, এটা কাম্য নয়। তার চিকিৎসার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার সুযোগ থাকলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। আমার বিশ্বাস, সঠিক চিকিৎসা ও যথাযথ পুনর্বাসনের সুযোগ পেলে সে আবারও ক্রীড়াঙ্গনে ফিরে এসে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার যোগ্যতা রাখবে।”
স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রত্যাশা একটাই- একটা ইনজুরি যেন সম্ভাবনাময় এই ফুটবলারের ক্যারিয়ারের সমাপ্তি না লেখে। সঠিক চিকিৎসা আর একটু সহযোগিতা পেলে হয়তো আবার সেই চেনা গতিতে মাঠ কাঁপাবেন রবিউল ইসলাম- যার চোখে এখনো জ্বলছে ফুটবলের স্বপ্ন।
