
সরকারি কাজের দরপত্রে আপনি চাইলেই দর দিতে পারবেন না।
কথাটি কোনো অভিযোগ নয়। এটি একজন সরকারি প্রকৌশলীর নিজের ব্যাখ্যা, নিজের দপ্তরে বসে দেওয়া।
২৬ জুলাই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম পওর বিভাগ-১-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী বর্ণ হককে প্রশ্নটি করা হয়েছিল সাদামাটাভাবে- কোটেশন পদ্ধতিতে দর দেওয়ার সুযোগ কারা পান?
উত্তরটা সাদামাটা ছিল না।
“কোটেশন আমরা নিজেরা কী করি, কনট্রাক্টরের লাইসেন্স সিলেক্ট করি। তিন থেকে পাঁচটা লাইসেন্স ইজিপিতে আমরা সিলেক্ট করব, তারাই কোটেশন দিবে, অন্য কেউ কিন্তু দেখবেও না, দিতেও পারবে না।”
কারা সেই তিন-পাঁচজন? ব্যাখ্যাটি এখানে আরও এক ধাপ খুলে যায়:
“সারা বছর টুকটাক টুকটাক যাদেরকে দিয়ে কাজ করাইছি, এদেরকে পেমেন্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে সিলেক্ট করে দিব।”
অর্থাৎ দরপত্র ডাকার আগেই ঠিক হয়ে থাকে কারা দর দেবেন- আর কেন দেবেন। কাজটি তাঁরা আগেই করে ফেলেছেন; এখন বিলটা তোলা দরকার।
[পার্শ্বপ্রতিবেদন-১: ‘ওরা দোকান-টোকান থেকে কপি-পেস্ট করে দেয়’]
[সরকারি কেনাকাটার ডিজিটাল ব্যবস্থা ই-জিপি বানানো হয়েছিল স্বচ্ছতার জন্য। চট্টগ্রাম জেলার তিন মাসের (২০২৬ সালের মার্চ, এপ্রিল ও মে) ২ হাজার ১৮৫টি সরকারি চুক্তির প্রতিটি নথি এক এক করে পড়ে দেখেছেন এ প্রতিবেদক; মোট মূল্য ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। ১৪ ধরনের যাচাই মিলিয়ে ১ হাজার ৬৪৯টি চুক্তিতেই অন্তত একটি “খটকা” বা “সতর্ক সংকেত” মিলেছে- খটকা মানে প্রমাণিত দুর্নীতি নয়, প্রশ্ন তোলার উপলক্ষ। পাঁচ পর্বের সিরিজের আজ দ্বিতীয় পর্ব।]
এক দপ্তর, এক দিন, ১৫ চুক্তি
এই ব্যাখ্যাটি হাতে নিয়ে দপ্তরটির খাতা পড়লে একটি দিন আলাদা করে চোখে পড়ে।
২০২৬ সালের ১৯ মে, মঙ্গলবার। ওই এক দিনে সই হলো ১৫টি চুক্তি- সবগুলোর কার্যাদেশ জারি হয়েছিল ঠিক আগের দিন। সব কটিই কোটেশন পদ্ধতির, সবগুলোর টাকার উৎস একটিই বাজেট লাইন, আর প্যাকেজ নম্বরও প্রায় ধারাবাহিক- বারোটির গায়ে লেখা “আনোয়ারা/আরএফকিউ-১” থেকে “আনোয়ারা/আরএফকিউ-১২”।
সাতটি কাজ পেল একটি প্রতিষ্ঠান, এম/এস প্যাসিফিক ইঞ্জিনিয়ার্স- পতেঙ্গা ও দক্ষিণ কাট্টলীর ড্রেন থেকে বর্জ্য অপসারণ, সলিমপুরে খাল পুনঃখনন, আনোয়ারায় বাঁধ মেরামত, আর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নৌ-কুচকাওয়াজ পরিদর্শন উপলক্ষে পতেঙ্গার ফ্লাড ওয়াল রং করা।
মূল্যগুলো যেন মেপে বসানো: ১,৯৯,৫৮৮ টাকা। ১,৯৯,৫৮৪ টাকা। ১,৯৯,৫৮০ টাকা। ১,৯৯,৫৫৯ টাকা। ১,৯৮,৯৬৯ টাকা।
পাঁচটিই থামল ২ লাখের ঠিক নিচে।
পাঁচটি কাজ পেল রাব্বি এন্টারপ্রাইজ। তার দুটি চুক্তির মূল্য পয়সা পর্যন্ত হুবহু এক: ৪,৯৯,১৪২.৮৮ টাকা এবং ৪,৯৯,১৪২.৮৮ টাকা- দুটিই ৫ লাখের ঠিক নিচে। একটির কাজের বিবরণ “নদীর ভূরূপতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ (জরিপ)”, অন্যটির “নদীর ভূরূপতাত্ত্বিক তথ্য সরবরাহ”।
সংগ্রহ আর সরবরাহ- দুই শব্দের ফারাকে দুই চুক্তি, এক দামে।
এক দপ্তর, এক দিন, ১৫ চুক্তি, ৪১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা- দশটিই ২ লাখের নিচে।
সীমার ঠিক নিচে দেয়াল
সরকারি কেনাকাটার নিয়মের স্থাপত্যটি সহজ: অঙ্ক যত বড়, তদারকি তত কড়া; অঙ্ক যত ছোট, পথ তত সরল। পিপিআর ২০২৫-এর বিধি ২৫(৬) ঠিক এই ফাঁকটিই বন্ধ করতে চেয়েছে- ক্রয়কারী “কোনো নির্দিষ্ট ক্রয়পদ্ধতি বা উর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা পরিহারের উদ্দেশ্যে” ক্রয়চাহিদা ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করবে না।
তাহলে চট্টগ্রামের ২ হাজার ১৮৫টি চুক্তির মূল্য কোথায় থামছে? প্রতিটি সীমার দুই পাশে ১০ হাজার টাকার সমান জানালায় গুনে দেখা গেল:
প্রাক্কলন যদি সত্যিই কাজের পরিমাপ থেকে আসত, সীমার দুই পাশে সংখ্যা মোটামুটি সমান হওয়ার কথা। আর যত ওপরের সীমা, যেখানে এমনিতেই বড় তদারকি, বৈষম্য তত কম হওয়ার কথা। খাতা ঠিক উল্টো ছবি দেখাচ্ছে।
কয়েকটি একক নমুনা: বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তিনটি দপ্তরে তিনটি চুক্তির মূল্য ১,৯৯,৯৯০ টাকা, ১,৯৯,৯৮০ টাকা ও ১,৯৯,৯৫৬ টাকা। ২ লাখ থেকে মাত্র ১০ টাকা কম, ২০ টাকা কম, ৪৪ টাকা কম।
এই সংখ্যাগুলো নিজে থেকে কাজ-ভাগ প্রমাণ করে না; এগুলো সতর্ক সংকেত। সন্দেহ জোরালো হয় তখনই, যখন একই দপ্তর একই দিনে একই ঠিকাদারকে পরপর সীমার নিচের চুক্তি দেয়।
বছরের কোটা, শেষ দুই মাসে
১৯ মে-র সেই ১৫ চুক্তিতে ফেরা যাক, এবার আইনের পাশে রেখে।
কোটেশন যাতে নিয়মিত কেনাকাটার রাজপথ না হয়ে ওঠে, সে জন্য বিধিতে বার্ষিক সীমা বেঁধে দেওয়া আছে- জেলা পর্যায়ের দপ্তরে পরিচালন বাজেটের কার্য-ক্রয়ে বছরে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা।
দপ্তরটির তিন মাসের কোটেশন-চুক্তি যোগ করলে প্রথমে দাঁড়ায় ৬৪ লাখ ৪৭ হাজার টাকা- সীমার অনেক ওপরে। কিন্তু যোগফলটি ভাঙলে ছবি বদলায়। ৫০ লাখের সীমাটি কেবল পরিচালন বাজেটের কার্য-ক্রয়ের; পণ্যের সীমা আলাদা, আর উন্নয়ন বাজেট এই হিসাবের বাইরে। আলাদা করলে পরিচালন বাজেটে কার্য-কোটেশন ১৯টি, ৪৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।
অর্থাৎ সীমা পেরোয়নি। ব্যবহার হয়েছে বার্ষিক সীমার ৯৩.৭ শতাংশ।
সীমা না পেরোনোটাই এখানে গল্পের শেষ নয়- শুরু। কারণ ৯৩.৭ শতাংশ কোনো দুর্ঘটনা নয়। দপ্তরের নিজের অনুমোদিত বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনাতেই (এপিপি) গোটা অর্থবছরের জন্য কোটেশনে কার্য-ক্রয় ধরা ছিল ঠিক ৪৭ লাখ টাকা- সীমার ৯৪ শতাংশ। পরিকল্পনার সময়ই ঠিক করা হয়েছিল, বছরের কোটেশন-কোটার প্রায় পুরোটাই ব্যবহার হবে।
আর ব্যবহারটা হলো কখন?
ওই ২২টি চুক্তির একটিও মার্চে সই হয়নি। পাঁচটি এপ্রিলে, বাকি ১৭টি মে মাসে- তার অর্ধেকের বেশি একটিমাত্র দিনে। জুলাইয়ে শুরু হওয়া একটি অর্থবছরের গোটা কোটেশন-কর্মসূচি কাগজে গড়িয়েছে বছরের শেষ দুই মাসে।
এই প্রশ্নে দপ্তর জবাব দিয়েছে, খোলামেলাভাবেই। বর্ণ হক ও পটিয়া অঞ্চলের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার দাবি করেন, তাঁরা সীমার অনেক নিচে আছেন- “আমরা সিলিংয়ের থেকে আরও অনেক কমে আছি।” এপিপির কপি চাইতেই বর্ণ হক তাৎক্ষণিক রাজি- “এটা একশ বার পাওয়া যাবে… দাঁড়ান আমি এপিপিটা আপনাকে প্রিন্ট করে দেই।” দুই দিন পর তিনি পাঠিয়ে দেন পূর্ণ এপিপি ও বাপাউবোর আর্থিক ক্ষমতা-সংক্রান্ত সার্কুলার।
নথি মিলিয়ে দেখা যায়, তাঁর স্মৃতি থেকে বলা সংখ্যাগুলো অবিকল ঠিক।
নথিগুলো আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট করে- সিদ্ধান্তটি কোন স্তরের। সার্কুলার বলছে, পরিচালন খাতে কোটেশনে কার্য-ক্রয়ের পরিকল্পনা অনুমোদন করেন প্রধান প্রকৌশলী পর্যায়ের কর্মকর্তা। প্রশান্ত তালুকদারের ভাষায়, “ক্রয় পরিকল্পনার বাইরে আমাদের টেন্ডার হওয়ার সুযোগ নাই… ২ লাখ টাকার এপিপি পাস করলে ২ লাখ টাকারই টেন্ডার করতে পারবে সে।”
“আমার দপ্তর শুধু অঙ্কটা দেখে”
প্রশ্নটির ঠিকানা তাই ওপরে।
৪ ও ৬ আগস্ট- দুই দিন পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী খ. ম. জুলফিকার তারেকের দপ্তরে যান এই প্রতিবেদক; দুবারই তিনি ছিলেন না। ৬ আগস্ট সকালে ফোনে পাওয়া গেলে জানা যায় তিনি ঢাকায়। কোটেশনের অনুমোদন তাঁর দপ্তর থেকেই হয়- এ কথা তুলতেই তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল প্রশ্নটি নিচে ফিরিয়ে দেওয়া: “আমার এখান থেকে তো আর হয় না, এক্সেন অফিস থেকে হয়। এক্সেন আছে তো, এক্সেনদের কাছে যান।”
সেদিন বিকেল ৩টা ৩৬ মিনিটে পাঁচটি লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয় তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে ও ই-মেইলে, সঙ্গে ১৯ মে-র ১৫ চুক্তির পূর্ণ তালিকা। দুই ঘণ্টার মধ্যে জবাব আসে- এই অনুসন্ধানে যত দপ্তরে প্রশ্ন গেছে, তার মধ্যে দ্রুততম।
নিজের দপ্তরের ভূমিকা তিনি ব্যাখ্যা করেন ইংরেজিতে, এক লাইনে: “My office just check the amount requested has within public procurement rule or not.”
অর্থাৎ তাঁর দপ্তর দেখে কেবল একটি জিনিস- চাওয়া অঙ্কটি বিধির সীমার ভেতরে কি না। সীমার ভেতরে হলে অনুমোদন হয়ে যায়। কোন পদ্ধতিতে ক্রয় হবে, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর ভাষায় ক্রয়কারী দপ্তরেরই আইনি অধিকার।
তাহলে বড় কাজকে ছোট ভাগে ভাঙা হয়েছে কি না, সেটি কে দেখে? প্রশ্নটি আবার পাঠানো হয়, বিধির ভাষা উদ্ধৃত করে। নয় মিনিটের মধ্যে দ্বিতীয় জবাব:
“If PE thinks that he divide it small lot to ensure achieve value for money then I don’t see any problem. And RFQ is very small work, thus if PE subdivided it into few lot then it will not make any potential deviation.”
অর্থাৎ ক্রয়কারী দপ্তর যদি মনে করে অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য কাজটি ছোট ভাগে ভাঙা দরকার, তাতে তিনি সমস্যা দেখেন না।
বক্তব্যটি বিধিবিরুদ্ধ নয়। বিধি ২৫(৬) ভাগ করাকে নিষেধ করেনি, নিষেধ করেছে “প্রতিযোগিতা পরিহারের উদ্দেশ্যে” ভাগ করাকে। উদ্দেশ্য সত্যিই অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার হলে ভাগ করা বৈধ। তিনি ঠিক সেই শর্তটির ওপরই দাঁড়িয়েছেন।
কিন্তু ঠিক সেখানেই প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে যায়। উদ্দেশ্য কী ছিল, তা জানতে হলে কাউকে তো দেখতে হবে।
মাঠপর্যায় বলছে, পরিকল্পনার বাইরে তারা যেতে পারে না। আর অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ বলছেন, তাঁরা কেবল অঙ্কটি সীমার ভেতরে কি না তা-ই দেখেন।
ফল দাঁড়ায় এই: বিধি ২৫(৬) কাগজে আছে, কিন্তু ব্যবস্থার কোনো স্তরে কেউ তা যাচাই করে না। যে শর্তটির ওপর ভাগ করার বৈধতা নির্ভর করছে, সেই শর্তটিই কেউ পরীক্ষা করে না।
বছরের কোটেশন-কোটার ৯৪ শতাংশ পরিকল্পনাতেই ধরে রাখা কেন, আর তার পুরোটা কেন শেষ দুই মাসে খরচ হলো- এই দুটি প্রশ্নের জবাব দুই বার্তার কোনোটিতেই আসেনি।
[পার্শ্বপ্রতিবেদন-২: “দুই ঘণ্টায় দুই বার্তা”]
যে যুক্তিটি দেওয়া হয়
দপ্তরের ব্যাখ্যা দুটি, এবং দুটিই দেখতে যুক্তিসংগত। প্রথমটি সীমার- তাঁরা সীমা পেরোননি, নথিতেও তা-ই। দ্বিতীয়টি বাস্তবতার: কোটেশন ব্যবস্থাটি আসলে সারা বছরের ছোট ছোট জরুরি মেরামতের বিল মেটানোর পথ। পতেঙ্গার স্লুইসগেট বন্যার আগে পরিষ্কার রাখতেই হয়, দেরি করার সুযোগ নেই।
জলাবদ্ধতা ঠেকানোর জরুরিতা অস্বীকার করার নয়। কিন্তু যুক্তিটি তিন জায়গায় হোঁচট খায়।
এক, প্রশ্নটি সীমা লঙ্ঘনের নয়। বছরের কোটার ৯৪ শতাংশ পরিকল্পনাতেই ধরে রেখে তার পুরোটা শেষ দুই মাসে খরচ করা- এটি বিধির অক্ষর ভাঙে না, কিন্তু বিধিটি যে উদ্দেশ্যে লেখা- ক্রয়কে সারা বছর ছড়িয়ে দেওয়া, তার সঙ্গে মেলে না।
দুই, ঠিক এই ধরনের পরিস্থিতির জন্যই পিপিআর ২০২৫-এ বিধিবদ্ধ পথ আছে: “প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অনুরূপ সংকট মোকাবেলায়” সরাসরি ক্রয়ের সুযোগ- কারণ লিপিবদ্ধ করে, কার্যালয় প্রধানের অনুমোদন নিয়ে। বছরভর অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করিয়ে বছরশেষে তা “প্রতিযোগিতামূলক কোটেশন” নামে কাগজে ফিরিয়ে আনা- এই দুই পথের ফাঁকটাই এখানে প্রশ্ন।
তিন, যাঁরা দর দেবেন তাঁদের দপ্তর নিজেই বেছে রাখে, আর বেছে রাখার উদ্দেশ্যই বিল পরিশোধ- এই তথ্যটি ব্যাখ্যাকে দুর্বল করে না, প্রশ্নটিকে নতুন করে জোরালো করে।
অর্থবছরের শেষে কাজের চাপ যে বাস্তব, তা অস্বীকার করেন না প্রশিক্ষকেরাও। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রজেক্ট ম্যানেজার ও বিপিপিএর তালিকাভুক্ত জাতীয় ক্রয়-প্রশিক্ষক শাহানা ফেরদৌস জানান, বড় প্রকৌশল দপ্তরে বরাদ্দ আসে মে-জুন মাসে, ফলে বিধি মেনে দরপত্র শেষ করার সময়টুকুই থাকে না। আগে সমাধান খোঁজা হতো নিয়মের বাইরে- “আনঅফিশিয়ালি আমাদের অফিস থেকে বলা হতো, তোমরা টেন্ডার প্রসেসে চলে যাও, কিন্তু টেন্ডার ওপেন করবা না।” সেই চর্চাকেই এবার আইনি রূপ দেওয়া হয়েছে “অ্যাডভান্স প্রকিউরমেন্ট” নামে।
বৈধ পথটি যখন খোলা, তখন প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট: বছরের কোটেশন-কোটার ৯৪ শতাংশ শেষ দুই মাসের জন্য জমিয়ে রাখা হলো কেন?
দ্বিতীয় দরজা: তিন দিনের জানালা
কারা দর দেবেন, তা সংকুচিত করার আরেকটি পথ আছে- সময়।
বিধি অনুযায়ী সীমিত দরপত্রে দর প্রণয়ন ও দাখিলের জন্য স্বাভাবিক ক্ষেত্রে সময় দিতে হয় ন্যূনতম ১০ দিন; পুনঃদরপত্রে ৭ দিন, আর ৫ দিনের কম কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগে, কার্যালয় প্রধানের অনুমোদন নিয়ে।
চট্টগ্রাম গণপূর্ত ইএম বিভাগ-১-এর খাতা বলছে, সেই জানালাটি কোথাও তিন দিনের। ৫ মার্চ সকালে বিজ্ঞাপন, ৮ মার্চ কার্যাদেশ- এই তিন দিনে দরপত্র প্রস্তুতি, খোলা, মূল্যায়ন ও অনুমোদন সবই শেষ।
দপ্তরটির ৩৫টি চুক্তির ২৪টিতেই বিজ্ঞাপন থেকে কার্যাদেশের ব্যবধান ১০ দিনের কম, ১২টিতে ৭ দিনের কম। মূল্যগুলোও জমেছে দুটি অতি-সরু ব্যান্ডে; পাঁচটি চুক্তির মূল্য ১,৮৯,৭০০ থেকে ১,৮৯,৯৯৪ টাকার মধ্যে, আরও পাঁচটির ২,৮৩,৭০০ থেকে ২,৮৪,৯৩৬ টাকার মধ্যে।
৩৫টি চুক্তি ভাগ হয়েছে ১৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে, আর শীর্ষ তিনটিই নিয়েছে ১৪টি- ৪০ শতাংশ।
দপ্তরটির নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান ইবনে কামালের ব্যাখ্যা কড়া ও সরাসরি। জরুরি কাজে সময় কমানো যায়, এবং ই-জিপি নিজেই তা করতে দেয়: “এলটিএমে আর্জেন্ট ক্যাটাগরির টেন্ডার সাত দিনের কম করা যায়। ইজিপিতে সেটা অ্যালাউ করে।” প্রতিযোগিতা হয়নি- এই ইঙ্গিতও তিনি মানেন না: “এখানে কিন্তু প্রতিটাই কম্পিটিটিভ।” আর কাজগুলো সত্যিই হয়েছে কি না, তা যাচাই করে দেখতে তিনি নিজেই আমন্ত্রণ জানান: “আমি বলব যে যাচাই করেন, কোনো কাজে কোনো অনিয়ম হলো কি না।”
এসি বসানোর কাজ কতটা জরুরি- এই প্রশ্নে তাঁর জবাবে আসে প্রত্যাশী সংস্থার চাপের কথা। জেলা ও দায়রা জজ পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রাধিকারপ্রাপ্ত, তাঁদের চাহিদা দপ্তরকে জরুরি হিসেবেই নিতে হয়- “আমি কোনো প্রত্যাশী সংস্থা সম্পর্কে কটু কথা বলব না… তবে তারা জরুরি বলেই মনে করে।”
জমজ প্রাক্কলনের ব্যাখ্যাটিও তাঁর কাছে সরল: দুই আদালতের দুই কক্ষ হুবহু এক হলে প্রাক্কলনও এক হবে। আর ১৬টি প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গে জানান, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান আসলে ৩৫-৪০টি; সবাই দেখতে পান, কিন্তু সবাই একই হারে ছাড় দেন- “এলটিএম মানে হচ্ছে ৫% লেস, সবাই সমান হারে দেয়। যে আসে সে দেয়; যদি মনে করে কাজগুলো লাভজনক হবে না, তখন তারা আসে না।”
এই ৩৫টির অর্ধেক টাকাই- ৫৫ লাখ ১৫ হাজার টাকার ১৩টি চুক্তি- চট্টগ্রামের বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠানের ভবনের কাজ। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রসিকিউশন শাখায় শীতাতপযন্ত্র বসানোর দরপত্রেও ঠিকাদারের হাতে সময় ছিল পাঁচ দিন। দুদক বা আদালত এসব দরপত্রের ক্রয়কারী নয়- ভবনের ব্যবহারকারী মাত্র, ডেকেছে গণপূর্ত। তবু প্রশ্নটি বড় হয়: যে প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যের হিসাব চায়, তাদের নিজেদের কেনাকাটার হিসাব কে চায়?
আর সবচেয়ে স্পষ্ট নমুনাটি ৭ মে-র।
চন্দনাইশ, পটিয়া, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া- চার উপজেলার চার মডেল মসজিদে ডেস্কটপ, প্রিন্টার ও ইউপিএস সরবরাহের চারটি আলাদা চুক্তি। প্রতিটির মূল্য হুবহু এক: ১,৩২,৩৫০ টাকা। চারটিরই বিজ্ঞাপন ৭ মে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে- একই মিনিটে। কার্যাদেশ, সই, কাজ শুরু ও শেষের তারিখ অভিন্ন। ঠিকাদারও অভিন্ন, ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান। আলাদা কেবল উপজেলার নাম।
চারটির সমষ্টি ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪০০ টাকা। আর কোটেশনে পণ্যক্রয়ের সীমা প্রতিটি ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা।
একটিমাত্র প্যাকেজ হলে অঙ্কটি সীমা পেরিয়ে যেত- যেতে হতো দরপত্রে, প্রতিযোগিতা বাড়ত। চার টুকরো হওয়ায় প্রতিটি সীমার নিচে থেকে গেল। দপ্তর যুক্তি দিতে পারে, চার উপজেলার জন্য চাহিদা চারটি। তবে বিধিতে ভৌগোলিক অবস্থানের ছাড়টি কেবল কার্য-চুক্তিতে- পণ্যক্রয়ে নয়।
তৃতীয় দরজা: নামেই বন্ধ
প্রতিযোগিতা আটকানোর সবচেয়ে সরল উপায়টি অবশ্য সময় বা টাকা নয়- নাম।
পিপিআর ২০২৫-এর বিধি ৩৮(৩) বলছে, কারিগরি বিনির্দেশে “কোনোক্রমেই কোনো সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের… নাম উল্লেখ করা যাইবে না”; ব্যতিক্রমেও সঙ্গে “বা সমতুল্য” শব্দগুচ্ছ যোগ করতেই হবে।
[পার্শ্বপ্রতিবেদন-৩: “সীমা, সময় ও ব্র্যান্ড: বিধিতে ঠিক কী লেখা আছে”]
চট্টগ্রামের তথ্যভান্ডারে ছয়টি চুক্তির প্যাকেজের নামেই ব্র্যান্ড লেখা, “সমতুল্য” শব্দ ছাড়া। সবচেয়ে চোখে লাগে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের জোড়া চুক্তি: একই দপ্তর, একই পণ্য এক্স-রে ফিল্ম, অথচ একটির দরপত্রের নামে লেখা “Fuji”, আরেকটিতে “Agfa”- বিশ্ববাজারে পরস্পরের সরাসরি প্রতিযোগী দুই ব্র্যান্ড।
ফলাফলও নথিতে: দুটি চুক্তি গেল ঢাকার দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠানের কাছে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন তিন দিন পর নিজেই ফোন করেন। তাঁর ব্যাখ্যা প্রযুক্তিগত- “ওই মেশিনগুলোতে অন্য কোনো জিনিস সাপোর্ট করে না। আপনি দিলে নিবে না। এগুলো হচ্ছে ক্লোজড মেথড।” তারপর জিজ্ঞেস করার আগেই তিনি যোগ করেন এমন একটি কথা, যা প্রশ্নটিকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেয়:
“সারা দেশের প্রত্যেকটা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই একই চিত্র… এরা তো মনোপলি ব্যবসা করতেছে, একচেটিয়া ব্যবসা করে যাচ্ছে।”
কিন্তু বিধিটি প্রযুক্তিগত বাধ্যবাধকতার কোনো ছাড় দেয়নি। ব্র্যান্ড লিখলে “বা সমতুল্য” লিখতেই হবে, দরজাটা অন্তত কাগজে খোলা রাখতে হবে। নিয়মটি যে মানা যায়, তা দেখিয়েছে একই তথ্যভান্ডারের আরেকটি দপ্তর: রেলওয়ের পাহাড়তলী ওয়ার্কশপ ড্রিল মেশিন কিনতে গিয়ে প্যাকেজের নামেই লিখেছে- “Brand-BOSCH or equivalent”।
তুলনাটি শোনার পর চমেক হাসপাতালের পরিচালকের জবাব ছিল সংক্ষিপ্ত: “আমরা আগামীতে এই বিষয়ে সতর্ক থাকব।”
“সিস্টেম যা অ্যালাউ করে, সেটা স্ট্যান্ড ওভার এভরিথিং”
তিনটি দরজাই বন্ধ হতে পারে একটিমাত্র কারণে: ই-জিপিতে কোনো স্তরেই স্বয়ংক্রিয় সতর্কঘণ্টা নেই। এক দিনে এক ঠিকাদারের সাত চুক্তি সিস্টেম আটকায় না; কোটেশন-ব্যয় বার্ষিক সীমার দিকে ছুটলে গোনে না; প্যাকেজের নামে ব্র্যান্ড থাকলে চিনতে পারে না।
কেন পারে না, তার উত্তরটি এসেছে অপ্রত্যাশিতভাবে- একজন প্রকৌশলীর একটি বাক্যে। ই-জিপি কেন কম সময়ের দরপত্র নিয়ে নেয়, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাসান ইবনে কামাল বলেন:
“আইনে বলাও আছে যে ইলেকট্রনিক প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম যেটা অ্যালাউ করে, সেটা স্ট্যান্ড ওভার এভরিথিং- মানে বিধিতে যা আছে, তার উপরে।”
সিস্টেম যা অনুমোদন করে, তা-ই চূড়ান্ত। বিধি কী বলছে, সেটি এরপরের প্রশ্ন।
ব্যবস্থাটি আইন প্রয়োগের যন্ত্র হিসেবে বানানো হয়েছিল। ব্যবহারে সেটি নিজেই আইন হয়ে উঠেছে।
সেই ১৯ মে-তে ফিরি। সেদিন যে ফ্লাড ওয়ালটি রং হওয়ার কথা, সেটি পতেঙ্গায়- রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী নৌবাহিনীর কুচকাওয়াজ দেখতে আসবেন বলে।
৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকার সেই রঙের নিচে ঢাকা পড়ে থাকল আসল ছবিটা: এক দপ্তর, এক দিন, ১৫ চুক্তি; দশটি ২ লাখের নিচে; দুটি পয়সায়-পয়সায় জমজ; আর বছরের কোটেশন-কোটা তিন মাসেই প্রায় শেষ।
একা দেখলে প্রতিটিই সাধারণ ছোট মেরামতকাজ। একসঙ্গে দেখলে একটি ধরন: বরাদ্দ ভাগ হয় ছোট প্যাকেজে, অঙ্ক থামে সীমার নিচে, সময় নামে তিন দিনে, প্যাকেজের নামেই বসে যায় ব্র্যান্ড- আর দর দেন আগে থেকে বেছে রাখা তিন-পাঁচজন।
পতেঙ্গা বা দক্ষিণ কাট্টলীর যে মানুষটি প্রতি বর্ষায় হাঁটুপানির রাস্তায় অফিসে যান, তিনি জানেন না তাঁর ড্রেন পরিষ্কারের বরাদ্দ কেন সাত টুকরোয় ভাগ হলো।
আর দরজাটি আরও একভাবে বন্ধ হতে পারে- যখন দুই “প্রতিযোগীর” মালিক একজনই। সেটি পরের পর্বে।
আগামীকাল পড়ুন: ‘এটা ১০০% পেতে পারি আমি’: এক মালিকের দুই প্রতিষ্ঠান, ৮২ শতাংশ কাজ
প্রথম পর্ব পড়ুন: ২৪৮ জন বনাম ২ জন: যে তুলনাটা আর কেউ করতে পারবেন না
সরকারি কেনাকাটার ছয় ধাপ
সরকারি কেনাকাটার ছয়টি ধাপ পরপর ঘটার কথা: প্রথমে দরপত্র আহ্বান, অর্থাৎ বিজ্ঞাপন প্রকাশ। এরপর দাখিল ও মূল্যায়ন- কে যোগ্য, কার দর কত। তারপর চুক্তিসম্পাদনের নোটিশ বা কার্যাদেশ (এনওএ; কথ্য ভাষায় বলা হয় “নোয়া”)- কাকে কাজ দেওয়া হলো, তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এর পরের ধাপ কার্যসম্পাদন জামানত (পিজি)- ঠিকাদারের জমা দেওয়া টাকা, যা কাজ না করলে বাজেয়াপ্ত হয়। জামানত ব্যাংকে যাচাই হওয়ার পরই হয় চুক্তি স্বাক্ষর। আর সবশেষে শুরু হয় কাজ।
সহজ কথায়: আগে কাগজ, পরে কাজ। এই ক্রম উল্টে গেলে কী দাঁড়ায়- সেটিই এই সিরিজের বিষয়।
[এই অনুসন্ধানের ভিত্তি হওয়া প্রতিটি চুক্তির টেন্ডার আইডি, সংকেতের (খটকা) হিসাব ও আর্কাইভ লিংকসহ পূর্ণ তথ্যভান্ডার প্রকাশিত হবে সিরিজের শেষ (পঞ্চম) পর্বের সঙ্গে, একসঙ্গে- যাতে পাঠক পুরো সিরিজের প্রতিটি দাবি নিজে মিলিয়ে দেখতে পারেন।]

