
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিয়োগ তালিকায় দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে- এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক আবেদনকারী। তাঁদের দাবি, যোগ্যতা ও পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক পরিচয় ও সুপারিশের ভিত্তিতে অনেকের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাওয়া অধিকাংশ ব্যক্তি বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার নামও তালিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া নিয়োগে ৫০ শতাংশ নারীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন প্রার্থীরা।
গত ১৮ আগস্ট ভোরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসাইনের স্বাক্ষর করা একটি নিয়োগ তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকেই তালিকাটি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার শতাধিক আবেদনকারী অভিযোগ করেছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়নি। তাঁদের কেউ কেউ লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় ভালো করার পরও বাদ পড়েছেন বলে দাবি করেছেন।
তালিকায় ছাত্রলীগ নেতার নাম নিয়েও প্রশ্ন
ছনুয়া ইউনিয়নে সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন নাজিম উদ্দিন মোহাম্মদ রায়হান। তিনি ছনুয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একই ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মোহাম্মদ নুরুন্নবী। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি সাংবাদিক বেলাল উদ্দিনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।
ছাত্রদল নেতা হাসান মুহাম্মদ জুনাঈদ রাসেল বলেন, “লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় ভালো করার পরও আমার নাম আসেনি। আমি মাস্টার্স পাস করেছি। অথচ আমার চেয়ে কম যোগ্য একজন নিয়োগ পেয়েছেন।”
তিনি অভিযোগ করেন, “যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের অনেকেই বাঁশখালী বিএনপির একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের অনুসারী। আমি অন্য একজনের রাজনীতি করি বলে বাদ পড়েছি।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যোগ্যতা ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অভিযোগ
ছনুয়া ইউনিয়ন থেকে সুপারভাইজার পদে আবেদন করেছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আবদুল্লাহ আল মামুন ফয়সাল। তাঁর অভিযোগ, “আমার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই এমন হয়েছে।”
গণ্ডামারা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তথ্য সংগ্রহকারী পদে আবেদন করেছিলেন জান্নাতুল মাওয়া। তিনি বলেন, “আমাদের ওয়ার্ডে চারজন আবেদনকারী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে আমি আগে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছি এবং অভিজ্ঞতাও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”
তাঁর দাবি, নির্বাচিত প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা তাঁর তুলনায় কম।
ছাত্রলীগের কয়েকজনের নাম, তদন্তের কথা বললেন ইউএনও
নিয়োগ তালিকায় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার নাম থাকার অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও মো. রুহুল আমিন বলেন, “তালিকায় ছাত্রলীগের তিন থেকে চারজনের নাম এসেছে- এমন তথ্য পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে তাঁদের নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
তিনি বলেন, “দুই হাজারের বেশি আবেদন পড়েছে। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রায় ১৭৫ জনকে। সবাইকে তো নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়। বাদ পড়া অনেকেই অভিযোগ করছেন।”
নারীদের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, “নিয়োগে ৫০ শতাংশ নারীর অগ্রাধিকারের বিষয়টি ছিল। তবে আবেদনকারীদের মধ্যে নারী প্রার্থী কম থাকায় সেই অনুপাতে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি।”
পরীক্ষায় ভালো করা প্রার্থীরা বাদ পড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “শুধু পরীক্ষার ফল নয়, মাঠপর্যায়ের কাজের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতাও বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ তথ্য সংগ্রহের কাজটি মাঠভিত্তিক।”
সুপারিশের অভিযোগ, স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
আবেদনকারীদের অভিযোগ, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কোনো ধরনের সুপারিশ বা তদবির গ্রহণযোগ্য নয় বলা হলেও বাস্তবে তা অনুসরণ করা হয়নি। তাঁদের দাবি, চূড়ান্ত তালিকায় এমন কিছু ব্যক্তি স্থান পেয়েছেন, যাঁরা পরীক্ষায় পিছিয়ে ছিলেন।
তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, যদি ব্যক্তিগত বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে কেন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সাধারণ আবেদনকারীদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হলো।
এর আগে সার্টিফিকেট যাচাই-বাছাইয়ের সময় থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে বলে জানান আবেদনকারীরা। তাঁদের দাবি, অভিযোগ ওঠার পরও প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
নিয়োগ তালিকা বাতিল করে পুনরায় স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাঁশখালী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আমজাদ হোসাইনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
