
ভোর তখন সোয়া পাঁচটা। তুরস্ক থেকে আসা টি কে ৭১২ ফ্লাইট থেকে নামলেন এক মানুষ। দুটি পা নেই। বাংলায় কথা বলতে পারছেন না ঠিকমতো। শুধু জানেন নিজের নাম- মোহাম্মদ ফরিদ। বাবার নাম আয়ুব আলী। আর একটু একটু মনে আছে কোথায় তাঁর জন্ম হয়েছিল।
৩৫ বছর আগে শিশু বয়সে দেশ ছেড়েছিলেন। আজ ফিরলেন। কিন্তু কোথায় যাবেন, কে আছেন তাঁর- কিছুই জানেন না।
পাকিস্তান, তারপর তুরস্ক, তারপর দুটি পা হারানো
ফরিদের বয়স যখন আনুমানিক দশ বছর, তখন বাবার হাত ধরে জাহাজে উঠলেন। গন্তব্য পাকিস্তান। প্রায় দশ বছর সেখানে থাকার পর দালালরা তাঁকে সড়কপথে তুরস্কে নিয়ে গেল। তারপর থেকে পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। তুরস্কে একটি মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় কেটে গেল দুটি পা। তারপরও বেঁচে রইলেন। বছরের পর বছর অপেক্ষা করলেন- একদিন দেশে ফিরবেন, মায়ের কাছে যাবেন।
সেই দিন এলো আজ মঙ্গলবার।
১২ ঘণ্টায় মিলল পরিবারের সন্ধান
বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে ফরিদকে হস্তান্তর করা হলো ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে। সকাল থেকেই শুরু হলো অনুসন্ধান। সামাজিক মাধ্যমে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হলো। কক্সবাজারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হলো। পোস্টার লাগানো হলো বিভিন্ন এলাকায়।
বিকেলের মধ্যে সুনির্দিষ্ট তথ্য এলো। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ায় ফরিদের পরিবার। ব্র্যাকের কর্মীরা সেখানে গিয়ে নিশ্চিত করলেন- হ্যাঁ, এটাই তাঁর বাড়ি। দেশে ফেরার মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে মিলল পরিবারের সন্ধান।
পরিবার জানাল, ফরিদের বাবা আয়ুব আলী এখনো পাকিস্তানে। মা আছেন। ভাই আছেন- নাম ছৈয়দ আলম। তিনি বড় ভাইকে শেষবার দেখেছিলেন ৩৫ বছর আগে। এখন তাঁকে দ্রুত ঢাকায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, “৩৫ বছর পর একজন মা তাঁর সন্তানকে ফিরে পাবেন, একজন ভাই তাঁর ভাইকে ফিরে পাবেনG এর চেয়ে মানবিক পাওনা আর কী হতে পারে!”
ফরিদ এখন অপেক্ষায়। ভাই আসবেন। তারপর তিনিও যাবেন- মায়ের কাছে, নিজের বাড়িতে। দুটি পা নেই, কিন্তু বুকভরা স্বপ্ন আছে। ৩৫ বছরের দীর্ঘ পথ শেষে আজ ঘরে ফেরার পথ খুলে গেছে।
