কার্গো নেই, দাম দ্বিগুণ, গ্যাস-সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর

চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (সিইপিজেড) একটি গার্মেন্টস কারখানা। যেখানে শত শত শ্রমিক সকালে এসে দেখলেন মেশিন চলছে না, গ্যাস নেই। মালিক জানালেন, আজ উৎপাদন বন্ধ। রপ্তানি অর্ডারের ডেডলাইন ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু কিছু করার নেই। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়- সারা দেশে এখন এই একই চিত্র। কারণ একটাই: এলএনজি সংকট।

আর এই সংকটের পেছনে রয়েছে একটি সিদ্ধান্তের ব্যর্থতা, একটি বাজারের অস্থিরতা এবং একটি যুদ্ধের ছায়া- যা বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে, কিন্তু প্রভাব পড়ছে এখানকার প্রতিটি কারখানায়, প্রতিটি রান্নাঘরে।

ডিপিএমের চার কার্গো শূন্য, সংকট এখন অতল গভীরে

আগস্ট মাসে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) চারটি এলএনজি কার্গো আসার কথা ছিল। একটিও এলো না। এই একটি ব্যর্থতাই দেশের গ্যাস সরবরাহকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছে।

পেট্রোবাংলার সর্বশেষ তথ্য বলছে, সোমবার রাত ৮টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে মাত্র ২৩৭ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট- যেখানে সরকারি হিসাবেই চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, আর বাস্তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন চাহিদা ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ কোটি ঘনফুট।

পরিস্থিতি সামাল দিতে তিন দফায় জরুরি দরপত্র ডাকা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি দরপত্রে দাম বাড়ছে- ১৭ আগস্টে ২২ ডলার, ১৮ আগস্টে ২৪ ডলার, ১৯ আগস্টে ২৫ দশমিক ৩১ ডলার। এপ্রিলের দরের তুলনায় এখন একটি কার্গো কিনতেই বাড়তি গুনতে হচ্ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়- আগামীকাল বুধবার সামিটের টার্মিনালের জন্য একটি কার্গো আসার কথা থাকলেও সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। আর এক্সিলারেট টার্মিনালের পরবর্তী কার্গো ১ সেপ্টেম্বরের আগে আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

বিশ্ববাজারে যুদ্ধের আগুন, বাংলাদেশে গ্যাসের হাহাকার

সংকটের শিকড় শুধু দেশে নয়, বিশ্ববাজারেও। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের জেরে কাতার ও ওমান থেকে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ কার্যত বন্ধ। একই সময়ে শীতের আগেই ইউরোপ মজুত গড়তে মাঠে নেমেছে। ফলে বিশ্ববাজারে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। বছরের শুরুতে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ১১ ডলার, এপ্রিলে ১৪-১৫ ডলার, জুলাইয়ে ২২ ডলার, আর এখন চলতি মাসে ২৪ ডলারেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। শুধু দাম নয়—কার্গোই পাওয়া যাচ্ছে না।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) কর্মকর্তারা বলছেন, দরপত্র বারবার ডাকলেও সাড়া দেওয়ার মতো সরবরাহকারী কোম্পানি কম। বিশ্বজুড়ে এলএনজি কার্গোর সংকট চলছে, আর বাংলাদেশ সেই ঝড়ের সামনে কার্যত একা দাঁড়িয়ে।

শিল্পে গ্যাস না বিদ্যুৎ- দুই সংকটের মাঝে সরকারের কঠিন হিসাব

পরিস্থিতি সামলাতে সরকার এখন এক কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি। প্রায় এক মাস ধরে শিল্পে গ্যাস কমিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছিল। এতে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, বন্ধ হয়ে গেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এখন গত শনিবার থেকে উল্টো পথে হাঁটছে সরকার। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস ৯৫ কোটি থেকে কমিয়ে ৭৫ কোটি ঘনফুট করে সাশ্রয় হওয়া ২০ কোটি ঘনফুট শিল্পে দেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছে। ঘাটতি পূরণে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন চার হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

তবে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলছেন, ফার্নেস অয়েল আমদানিতে ৩০ শতাংশ শুল্কের বোঝা এখনই কমিয়ে ৫ শতাংশে আনা দরকার।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলছেন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নেই।

তবে এসব সমাধান দীর্ঘমেয়াদি। আপাতত বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিলে ঢাকা থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে লোডশেডিং দেওয়ার পরিকল্পনাও প্রস্তুত রয়েছে। সংকট কবে কাটবে, তার কোনো নিশ্চিত উত্তর এখন কারো কাছে নেই।