
ভেতরে ঢুকলে যে কারো বমি বমি ভাব হতো। কালো হয়ে যাওয়া তেলের কড়াই, মেয়াদোত্তীর্ণ মশলার প্যাকেট, মাছি ভনভন করছে চারদিকে। চাতরী চৌমুহনীর ভোজনবাড়ি রেস্টুরেন্টের এই রান্নাঘর থেকেই প্রতিদিন শত শত মানুষের পাতে পরিবেশন হচ্ছিল খাবার। এলাকার অনেকে জানতেন, দেখতেন, কিন্তু থেমে থাকত সব। কারণ কেউ কিছু করছিল না।
আজ মঙ্গলবার বিকাল চারটায় সেই নীরবতা ভাঙল। আনোয়ারা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু জাফর মজুমদার মোবাইল কোর্টের অভিযানে ভোজনবাড়ি রেস্টুরেন্টকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ঠুকলেন এবং পাঠালেন স্পষ্ট বার্তা- আনোয়ারায় ভেজাল আর অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিন শেষ।
যোগ দেওয়ার কয়েক সপ্তাহেই পাল্টে গেল চেনা ছবি
গত ২৭ জুলাই আনোয়ারা উপজেলায় যোগ দিয়েছেন মো. আবু জাফর মজুমদার। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনি এলাকায় একটি ভিন্নধর্মী প্রশাসনিক চরিত্র হিসেবে নিজেকে চেনাতে সক্ষম হয়েছেন। অনেক কর্মকর্তা যেখানে অফিসের চার দেয়ালেই সারাদিন পার করে দেন, সেখানে আবু জাফর মজুমদার একই সঙ্গে ভূমি অফিসের দাপ্তরিক জটিলতা কমাচ্ছেন এবং মাঠে নেমে সাধারণ মানুষের সমস্যা সরাসরি দেখছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. লোকমান বলেন, “বর্তমান এসিল্যান্ড স্যার যোগ দেওয়ার পর থেকেই ভূমি অফিসের ভোগান্তি যেমন কমেছে, তেমনি মাঠপর্যায়েও উনার নিয়মিত তদারকি দেখা যাচ্ছে।” কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশংসা নয়- একজন সাধারণ নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত মূল্যায়ন এটি।
রান্নাঘরে প্রবেশ করে দেখলেন আসল চিত্র
আজকের অভিযানে ভোজনবাড়ি রেস্টুরেন্টে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য ব্যবহারের প্রমাণ মেলে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৫৩ ধারায় রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
সমাজকর্মী রিদওয়ান আহমেদ বলেন, “ভেজাল ও নোংরা খাবারের বিরুদ্ধে উনার এই কঠোর অবস্থান সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি এনেছে।”
একই সপ্তাহে জয়কালী বাজারেও অভিযান, জরিমানা ১৫ হাজার
ভোজনবাড়ির ঘটনার মাত্র আট দিন আগে, ১১ আগস্ট বিকাল চারটায়, এসিল্যান্ড আবু জাফর মজুমদার অভিযান চালান আনোয়ারার জয়কালী বাজার ও তৎসংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন খাবার হোটেলে। সেখানেও একই চিত্র- অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিম্নমানের উপকরণ। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় দুটি হোটেলকে মোট ১৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। একইসঙ্গে হোটেল মালিকদের স্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার পরিবেশনের বিষয়ে সচেতন করা হয়।
লাইসেন্সবিহীন যানবাহনেও পড়ল আইনের হাত
এর একদিন আগে, ১০ আগস্ট, এসিল্যান্ড নামলেন চাতরী চৌমুহনীর সড়কে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় তিনটি মামলায় মোট ১১ হাজার টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়। লাইসেন্সবিহীন বিভিন্ন যানবাহনচালককে দেওয়া হয় কড়া সতর্কবার্তা।
কৈনপুরায় চোলাই মদসেবীদের কারাদণ্ড
সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপটি এলো ১৬ আগস্ট বিকাল পাঁচটায়। কৈনপুরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে নেপাল নাথ (২৬) ও টিটু সেন নামের দুই যুবককে চোলাই মদ সেবনরত অবস্থায় আটক করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় নেপাল নাথকে ১০০ টাকা জরিমানা ও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং টিটু সেনকে ৫০০ টাকা জরিমানা ও দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
চলবে মোবাইল কোর্টের অভিযান
অভিযান শেষে এসিল্যান্ড আবু জাফর মজুমদার বলেন, “অফিসের প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপদ খাদ্য ও অধিকার রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। এই মোবাইল কোর্ট অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।”
মাত্র কয়েক সপ্তাহে খাবার হোটেল, সড়ক আর মাদক- তিনটি ভিন্ন ক্ষেত্রে একের পর এক অভিযান চালিয়ে এসিল্যান্ড আবু জাফর মজুমদার আনোয়ারায় একটি বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন: আইনের বাইরে কিছু নেই, কেউ নেই। ভোজনবাড়ির রান্নাঘরে যে অন্ধকার এতদিন আড়ালে ছিল, সেটি আলোর মুখ দেখল। আনোয়ারার মানুষ অপেক্ষায় আছেন- পরবর্তী অভিযানে কোন দরজা খুলবেন এই এসিল্যান্ড।
