
ভোরের আকাশ তখনও গাঢ়। পাহাড়ের পাদদেশে আহলা গ্রামে প্রথম আজান পড়ার আগেই বাতাসে ভাসছিল দরুদের ধ্বনি। ১২ রবিউল আউয়াল। প্রিয় নবীর আগমন আর আধ্যাত্মিক পথিকৃৎ হযরত শাহ্সূফি সৈয়দ মাওলানা মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম নাছের মিয়ার (রহ.) বার্ষিক ওরশকে কেন্দ্র করে বোয়ালখালীর আহলা দরবার শরীফ গাউসিয়া আছাদিয়া ইসলামিয়া মঞ্জিল পরিণত হয়েছিল ভক্ত-সমুদ্রে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে দরবারের চূড়ায় উড়তে থাকে সবুজ নিশান। আয়োজনের দায়িত্বে ছিল আঞ্জুমানে আছাদিয়া ইসলামিয়া খেদমত পরিষদ বাংলাদেশ। পুরো মাহফিলের নেতৃত্ব দেন দরবারের সাজ্জাদানশীন শাহজাদা সৈয়দ মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন রাসেল আল মাইজভান্ডারী।
দিনের সূচনা হয় কোরআনের সুরে। খতম শেষে একে একে গুঞ্জরিত হয় হামদ, নাত, জিকির আর ছেমার তরঙ্গ। বেলা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে মানুষের ঢল। নগর চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, রাঙ্গুনিয়া, পটিয়া ও আনোয়ারা থেকে পায়ে হেঁটে, বাসে, সিএনজিতে ছুটে আসেন নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবক। অনেকের হাতে ছিল পতাকা, অনেকের ঠোঁটে অবিরাম দরুদ।
এবারের মিলাদ মাহফিলে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন মিসরের ঐতিহ্যবাহী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাওলানা মোহাম্মদ জিয়া উল্লাহ রিফায়ি। মাইক হাতে নিয়ে তিনি যখন উচ্চারণ করলেন, “নবীর ভালোবাসা ওলিদের দেখানো পথই পারে মানুষকে নাজাতের ঠিকানায় পৌঁছে দিতে”, তখন সমগ্র প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে “নারায়ে রিসালাত” ধ্বনিতে।
তাঁর আলোচনাজুড়ে ছিল মানবতার কথা। তিনি বলেন, রাসুলে কারিমের জীবনাদর্শই পারে সমাজের আঁধার ঘোঁচাতে। আর আউলিয়ায়ে কেরাম সেই আলোকে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন। বিভেদ ভুলে আজ আমাদের ঐক্যের পথে হাঁটতে হবে।
রাত গভীর হলে মোনাজাতের জন্য দাঁড়ান সাজ্জাদানশীন নিজে। দেশের শান্তি, মানুষের মুক্তি ও মুসলিম বিশ্বের সংহতির জন্য দুই হাত তুলে কেঁদে ওঠে হাজারো কণ্ঠ। দোয়ার পর বিলানো হয় তাবারুক। পেট ভরে, মন ভরে তবু কারও ঘরে ফেরার তাড়া ছিল না। তার আগে সুললিত কন্ঠে মিলাদ পরিচালনা আহলা দরবার শরীফের মাওলানা ওমর ফারুক।
দরবারের খাদেম শাফায়েত আহমদ মুন্না বলেন, বছরের এই দিনটির জন্য মানুষ মাসের পর মাস অপেক্ষা করে। খালি বুক নিয়ে আসে, ভরা ঈমান নিয়ে ফিরে যায়। এটাই নবীপ্রেম আর ওলি-আউলিয়ার বরকত।
মধ্যরাত পেরিয়েও নেভেনি দরবারের বাতি। কারও আঙুলে তসবিহ, কারও গলায় নাত। পাহাড়ঘেরা আহলা তখন যেন প্রেমের এক নীরব কবিতা, যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে ছিল ‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা।’
