
ফোনের অপর প্রান্তে এসআই সুমন কবির মৃধার কণ্ঠ- “ভাই, এগুলো কওন লাগে? রিপোর্ট দিতে কিছু খরচ আছে না?” এই একটি বাক্যই বলে দেয় বাঁশখালীর চন্দ্রপুর গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি নুরুল আলম কতটা অসহায় পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। চুরির শিকার হয়ে আদালতে মামলা করেছিলেন ন্যায়বিচারের আশায়। কিন্তু সেই ন্যায়বিচারের পথেই এখন দাঁড়িয়ে আছে টাকার দাবি।
আইনের কাছে সত্যের মূল্য সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু সেই সত্য এখন মাপা হচ্ছে নগদ টাকার অঙ্কে।
চুরির শিকার খামারি, তদন্তেও শিকার একই মানুষ
বাঁশখালীর চন্দ্রপুর গ্রামের বরপুরা এলাকায় জামশেদ এক্সপ্রেস ডেইরি এন্ড এগ্রো ফার্মের মালিক নুরুল আলম (৪৫)। গরু-মুরগি পালন করে কষ্টেসৃষ্টে চলে তাঁর সংসার। গত ২৩ জুন খামারে কর্মচারী নেন মাহমুদুল করিম ওরফে মাদুকে। নিয়োগের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় গত ৭ জুলাই দিবাগত রাতে ঘটে চুরি। প্রজেক্ট অফিসের ড্রয়ার থেকে নগদ ২৭ হাজার টাকা, পাঁচটি দেশি মুরগি এবং ৯০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ষাঁড় নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনার পর থেকে পলাতক সেই কর্মচারী। নুরুল আলম গত ২৬ জুলাই বাঁশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে তদন্তের দায়িত্ব দেন বাঁশখালী থানার ওসিকে। তদন্তভার পান রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই সুমন কবির মৃধা। এরপর থেকেই শুরু হয় নতুন যন্ত্রণা।
প্রথমে নাশতার বিল, পরে গাড়িভাড়া, তারপর পাঁচ হাজার
নুরুল আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলা করার প্রায় এক সপ্তাহ পর এসআই সুমন কবির মৃধা তাঁকে ফোন করে রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে আসতে বলেন। গুণাগরীতে গিয়ে ফোন করলে তাঁকে ‘পিউরিয়া’ নামের একটি দোকানে যেতে বলা হয়। সেখানে মামলার বিষয়ে কথা হয়- আর সেদিনই নাশতার বিল বাবদ গুনতে হয় ১ হাজার ২০০ টাকা। ফেরার পথে গাড়িভাড়ার কথা বলে নেওয়া হয় আরও ১ হাজার ৫০০ টাকা। গত ২৬ আগস্ট সরেজমিনে তদন্ত করতে খামারে যান এসআই। তদন্ত শেষে এবার দাবি করা হয় ৫ হাজার টাকা- ওসি স্যারকে দেওয়ার কথা বলে।
নুরুল আলম বলেন, “আমি একজন ক্ষুদ্র খামারি। আমি তখন তাকে ৩ হাজার টাকা দিয়েছি। দাবিকৃত বাকি টাকা না দিলে আমার পক্ষে রিপোর্ট দিবে না বলে সাফ জবাব দিয়েছে।” একজন চুরির শিকার মানুষ- যিনি ন্যায়বিচার পেতে আদালতের দরজায় গিয়েছিলেন, তাঁকেই বারবার পকেট খালি করতে হচ্ছে তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য।
‘রিপোর্ট দিতে খরচ আছে না?’—তদন্ত কর্মকর্তার বিস্ময়কর জবাব
এই প্রতিবেদক সরাসরি ফোন করেন এসআই সুমন কবির মৃধাকে। টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “টাকার বিষয়ে এটা কওন লাগে নাকি? মামলার রিপোর্ট দেওয়ার জন্য কিছু খরচ আছে না? এটা কেউ দেয়, আবার কেউ দেয় না। এটা যার যার ব্যাপার।”
ওসির নাম ব্যবহার করে টাকা দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, “রিপোর্ট দিতে দেরি আছে, সময় আছে আরও ৩ মাস।” এই বক্তব্যই প্রমাণ করে অভিযোগটি কতটা গুরুতর।
বাঁশখালী থানার ওসি রবিউল হক অবশ্য সরাসরি বলেন, “এটা একটা বদমায়েশ। পারফরম্যান্স খারাপ থাকলে চাকরিও করতে পারবে না।” তিনি আরও বলেন, “ওসির নাম তো সবাই বেচে।”
