
চট্টগ্রামের একজন সাধারণ নাগরিক, মো. সেলিম ভাবছেন, তাঁর ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য নিরাপদ আছে। পরিবারের আয়, সদস্যসংখ্যা, ঠিকানা- সব দিয়েছিলেন সরকারি সাইটে, বিশ্বাস করেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সেই সাইটটি অনেকদিন ধরে হ্যাকারদের দখলে। ব্রাউজারে সাইটের নাম লিখলে বেটিং সাইটের তথ্য দেখাচ্ছে। আর সেই তথ্য এখন কোথায়- ডার্কওয়েবে, টেলিগ্রামের অচেনা গ্রুপে, কোনো অজানা হাতে।
এটা শুধু একটি সাইটের গল্প নয়। এটা বাংলাদেশের সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থার ভেতরের ভয়াবহ চিত্র।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষক বাতায়ন, হ্যাকারদের দখলে একের পর এক সাইট
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের কনটেন্ট সরবরাহকারী অবকাঠামোতে অননুমোদিত কনটেন্ট ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাইট সার্চ করলে বেটিং, ক্যাসিনো ও অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন ভেসে উঠছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর এক্সপোর্ট ট্র্যাকার সিস্টেমে ক্লিক করলে হ্যাকারের বার্তা দেখাচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের স্মার্ট কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে লেখা ভাসছে- “হ্যাকড বাই ফোর্স এএনও।”
সারা দেশের শিক্ষকদের মূল ডাটাবেজ সিস্টেম শিক্ষক বাতায়ন হ্যাকারদের কবলে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল ইসলামের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরসহ গোপনীয় তথ্য এখন হ্যাকারদের গ্রুপে ঘুরছে। তাঁর মতো শত শত শিক্ষকের তথ্য আজ ওপেন সিক্রেট।
এর বাইরেও আক্রান্ত হয়েছে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ একাধিক সরকারি পোর্টাল।
পুলিশের ডাটাবেজ বিক্রি হচ্ছে টেলিগ্রামে
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো পুলিশের সিস্টেম নিয়ে। টেলিগ্রামের একাধিক চ্যানেলে পুলিশের ক্রিমিনাল ডাটাবেজ, জেনারেল ডায়েরি, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সসহ বিভিন্ন সিস্টেমের অ্যাকসেস বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। সামান্য টাকায় যে কেউ কিনে নিতে পারছেন কোনো ব্যক্তির নামে থাকা মামলার তথ্য।
এই পরিস্থিতিতে ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভির হাসান জোহা বলেন, “দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত, ঝুঁকি মূল্যায়ন, সাইবার অডিট ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সাইবার হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”
প্রযুক্তি বিশ্লেষক সহিবুর রহমান খান রানা বলেন, “বাইরে থেকে ওয়েবসাইট ঠিকঠাক দেখা গেলেও ভেতরে দুর্বলতা থাকতে পারে। ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হ্যাক হওয়া পেজ সরিয়ে ফেললেই বিপদ শেষ হয় না। মূল সিস্টেমে ব্যাকডোর থাকলে, ক্ষতিকর কোড থাকলে- হ্যাকার যেকোনো সময় আবার ঢুকতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর সাইবার অডিট হয়নি। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
চট্টগ্রামের সেই নাগরিক, সেলিম জানেন না তাঁর তথ্য কোথায় আছে। শিক্ষক সাইফুল জানেন না কে তাঁর আইডিতে ঢুকছে। রাষ্ট্রের ডিজিটাল দরজা খোলা পড়ে আছে- আর হ্যাকাররা নিরিবিলি লুটে নিচ্ছে নাগরিকের সবচেয়ে গোপন তথ্যগুলো।
