মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে দেশে ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্যমুক্তির সুযোগ নষ্ট


মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে বহুমুখী অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে দেশে প্রায় ছয় লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

একই সঙ্গে জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতির সংকটে প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নষ্ট হতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সীমিত কর্মসংস্থান, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্য কমানোর গতি কমেছে। ২০২৫ সালে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে।

চলতি বছর যুদ্ধ না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে এই সংখ্যা কমে প্রায় পাঁচ লাখে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ আরও ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্যমুক্তির সুযোগ নষ্ট হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, এ বছর দারিদ্র্য বাড়ার ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা থাকবে প্রায় ১০ শতাংশ। জ্বালানির বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে।

সংস্থাটি জানায়, এলএনজির ওপর বাংলাদেশের ব্যাপক নির্ভরতা বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করেছে। দেশে গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে।

অন্যদিকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে।

এমনকি সেপ্টেম্বরে সরবরাহের জন্য দুটি এলএনজি চালান কিনতে সরকারকে প্রতি ইউনিটে ২৪ ডলারের বেশি দিতে হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে ভর্তুকির চাপ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। এতে সামাজিক নিরাপত্তাসহ অন্য খাতে সরকারি ব্যয় কমানোর ঝুঁকি রয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ জানান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন বাস্তবসম্মত। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বছরে প্রায় এক লাখ কর্মী প্রেরণ কমে গেছে।

ড. মাসরুর রিয়াজ আরও জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় উৎপাদন কমাতে হচ্ছে। সংকট উত্তরণে সরকারকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং এলএনজি আমদানিতে বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে হবে।

দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে ওএমএস কর্মসূচির পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড বিস্তৃত করার পরামর্শ দেন ড. মাসরুর রিয়াজ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, জ্বালানির অভাবে অর্থনীতির ওপর তৈরি হওয়া চাপে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে কর্মরতদের ধরে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও জানান, নতুন সরকারের জন্য এই পরিস্থিতি বিব্রতকর। সরকারকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করে শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন সচল রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

যেসব এলাকায় কর্মহানির শঙ্কা বেশি, সেগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব দেশের কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতেও পড়ছে। দেশে সার উৎপাদনের জন্য গ্যাসের প্রয়োজন হলেও ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার পাঁচটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

ইউরিয়ার দামও প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে এবং সংকট দীর্ঘ হলে সারের দাম দ্বিগুণ হতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে দেশে প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ছয় হাজার ২০০ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে জেনারেটর চালাতে জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে।

দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল আমদানি করে এবং হাসপাতালের ৯০ শতাংশ সরঞ্জাম আমদানিনির্ভর। জ্বালানির দাম বাড়লে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ও বাড়বে বলে সতর্ক করা হয়েছে।