সাগর-রুনি হত্যায় দেড় দশক পর সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ক্লু


সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে অপেক্ষায় রয়েছেন সাংবাদিক সাগরের মা সালেহা মনির। নানা সময়ে খুনিদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেওয়া হলেও আজও বিচার পাননি তিনি। উল্টো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের দেওয়া এক নতুন তথ্যে তিনি আরও বিভ্রান্তিতে পড়েছেন।

রোববার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলা নিয়ে এই নতুন তথ্য সামনে আনেন।

তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা অন্য মামলার তদন্ত করতে গিয়ে হঠাৎ সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পেয়ে যায়।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার ঘটনা নিয়ে সাবেক মেজর মোজাফফর হোসেনের বিষয়ে কিছুটা ক্লু পাওয়ার মতোই সাগর-রুনির ব্যাপারেও ক্লু পাওয়া গেছে বলে চিফ প্রসিকিউটর উল্লেখ করেন।

তবে তিনি নাম-পরিচয় প্রকাশ না করে জানান, ওই ব্যক্তি একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাকে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং তিনি নজরদারিতে রয়েছেন।

এই দাবির পর সাগরের মা সালেহা মনির জানান, তাঁর ছেলে কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল না।

আগেও বিভিন্ন সময় নানামুখী বক্তব্য আসায় বিষয়গুলো তাঁর কাছে এলোমেলো লাগছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। কোনো নিরীহ মানুষ বলির পাঁঠা হোক, তা তিনি চান না, বরং প্রকৃত খুনিদের পরিচয় জানতে চান।

এদিকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে সন্দেহের তালিকায় রাখার কথা ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বলেছেন, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।

এর আগে ডিবি পুলিশ ও র‍্যাব কয়েক বছর ধরে মামলাটি তদন্ত করেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্টের নির্দেশে মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইপ্রধানকে আহ্বায়ক করে উচ্চ পর্যায়ের চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।

পুলিশ সদরদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, এর আগেও এই মামলার তদন্ত নিয়ে সরকারি সংস্থা থেকে নানা বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল।

তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সদরদপ্তরের নিয়মিত ক্রাইম কনফারেন্সে তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকারও তদন্তে অগ্রগতি ও রহস্য উন্মোচনের কথা বলেছিলেন।

মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজিজুল হক জানান, তারা অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং তদন্ত চলমান রয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টাস্কফোর্স দায়িত্ব পাওয়ার পর এ পর্যন্ত ৮৫ থেকে ৯০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
এদের মধ্যে সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি মশিউর রহমান, এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান ও তাঁর ভাই মাকসুদুর রহমান রয়েছেন।

এছাড়া অন্তত তিনজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং সাগর-রুনির সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য নেওয়া হয়েছে।

২০১৫ সালের জুনে আদালতে দেওয়া অগ্রগতি প্রতিবেদনে তৎকালীন তদন্ত সংস্থা র‍্যাব জানিয়েছিল, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা আলামত যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবে ফরেনসিক ও রাসায়নিক পরীক্ষার পর দুজন অজ্ঞাত পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ পাওয়া গেছে, যা আজও শনাক্ত হয়নি।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি দম্পতি খুন হন।

এ ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম রোমান আটজনের বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় পড়বে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, এটি কোনো সিস্টেম্যাটিক অপরাধ নয়, বরং একটি ইনডিভিজ্যুয়াল মার্ডার কেস হওয়ায় সংশ্লিষ্ট দায়রা আদালতেই এর বিচার হবে।