
১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের রায় মাথায় নিয়ে ক্ষমতায় এলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসলেন তারেক রহমান। তার কিছুদিন আগেই জুলাই-আগস্টের উত্তাল ঢেউ দেশের মানচিত্রটা নতুন করে এঁকে দিয়েছিল। মানুষ তখন শুধু সরকার বদল চায়নি, রাষ্ট্রের চরিত্র বদল চেয়েছিল। সেই প্রত্যাশার ভার কাঁধে নিয়ে নতুন নির্বাচিত সরকারের পথচলা শুরু হলো।
তবে ক্ষমতায় বসেই বিএনপি সরকার সময় নষ্ট করেনি। প্রথম মন্ত্রিসভার টেবিলেই খোলা হলো ১৮০ দিনের খতিয়ান। চারটি শব্দ সামনে রাখা হলো- দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ-গ্যাস, দুর্নীতি। এই চার দেয়ালের ভেতরেই মানুষের স্বস্তি-অস্বস্তি বন্দি।
১৮০ দিন। ছয়টি মাস। এই অল্প সময়ে সরকার ২০০-র বেশি উদ্যোগের পতাকা গেঁথেছে। প্রশাসনের জমে থাকা ধুলো ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। জনকল্যাণ, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা আর অর্থনীতির মাঠে বল গড়িয়েছে।
সবচেয়ে চোখে লাগার মতো ছবিটা চট্টগ্রামের লালদিয়ার চর। দীর্ঘদিন যে চর ছিল অবহেলার নদীচর, তাকে ঘিরে এখন স্বপ্ন বোনা হচ্ছে। উপকূলীয় অর্থনীতি, পর্যটন, কর্মসংস্থান- তিন নদীকে এক মোহনায় আনার পরিকল্পনা। যদি স্বচ্ছতা আর প্রকৃতির সঙ্গে আপস না করে এগোনো যায়, তবে লালদিয়া শুধু চট্টগ্রামের নয়, গোটা দেশের ভবিষ্যতের সঞ্চয় হয়ে থাকবে।
জনকল্যাণের খাতায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এখন মানুষের হাতে হাতে। বিরোধীরা প্রথমে বলেছিল, এটা হবে রাজনীতির খেলনা। কিন্তু ১৮০ দিনের মধ্যেই ৫ লাখ পরিবারের ঘরে প্রতি কেজি ১৫ টাকার চাল পৌঁছেছে। ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ও সুদ মওকুফের ফাইল নড়েছে। তবে এই কার্ড টিকিয়ে রাখতে চাই তৃতীয় পক্ষের অডিট, ইউনিয়ন ডিজিটাল বোর্ডে নামের তালিকা, আর অভিযোগের জন্য একটা খোলা হটলাইন। যাতে নাগরিক তার সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে।
নতুন সরকার বলছে, মূল্যস্ফীতি নেমেছে ৯.১৬ শতাংশে। কাগজে স্বস্তি, বাজারে এখনো ঘাম। চাল-ডাল-তেল-ওষুধ—দামের পাহাড় এখনো মানুষের মাথার ওপর। মূল্যস্ফীতি কমা আর দাম কমা এক কথা নয়। বাজার তদারকির পাশাপাশি উৎপাদন বাড়াতে হবে, সিন্ডিকেটের শিকল ভাঙতে হবে।
রাতের শহর ও মফস্বল এখনো পুরোপুরি ঘুমাতে পারে না। তবে এই ১৮০ দিনে কিছু দৃশ্য সাহস দেয়। ১৪ জেলায় যৌথ অভিযানে ২০০-র বেশি চাঁদাবাজ-ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার। পল্লবীর ধর্ষণ-হত্যা মামলার রায় ১৯ দিনে, মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কর্মদিবসে। দ্রুত বিচার মানে অপরাধীর বুকে কাঁপন। কিন্তু নাগরিকের নিরাপত্তাবোধ ফেরাতে চাই পুলিশের মনোবল আর বিচারের গতি। বিচার ধীর হলে ন্যায়বিচারও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। চট্টগ্রামেই বড় বড় সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে।
ভূমি- এই শব্দটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের চোখের জল। ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন প্রথম ১৮০ দিনেই সেই কাগজে নতুন কালি দিলেন। ই-নামজারি এখন বাধ্যতামূলক। ৪৫ দিনের কাজ নেমে এসেছে ২৮ দিনে। ঘরে বসে খাজনা দেওয়া যাচ্ছে। ১৬১২ হটলাইনে অভিযোগ রাখা যাচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ ৫ জেলায় শুরু হয়েছে ডিজিটাল জরিপ BDS, লক্ষ্য ২০৩০। ইউনিয়নে ‘ভূমি তথ্য ও সেবা কেন্দ্র’র কথা ভাবা হচ্ছে। জমি-জমা নিয়ে মানুষের কষ্ট কমানো অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ।
ব্যাংকিং খাত এখন সরকারের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা। গভর্নর বলছেন, মোট ঋণের ৩৬ শতাংশই খেলাপি। ১৮ মাসের পুনর্গঠন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে- এটা আশার কথা। কিন্তু আস্থা ফিরবে তখনই, যখন প্রভাবশালী আর সাধারণ খেলাপির জন্য আইন একই রকম কড়া হবে।
বিনিয়োগকারীরা এখনো দ্বিধায়। ২০৩৪ সালে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বিডা বলছে নীতির ধারাবাহিকতা নেই, ফাইল আটকায়। এফআইসিসিআই বলছে বন্দরে জট, গ্যাসে টান। আমলাতন্ত্রের দরজা খুলে দ্রুত সিদ্ধান্তের সংস্কৃতি না আনলে বিনিয়োগের টাকা দরজায় এসে ফিরে যাবে।
এই সরকারের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত এসেছে শিক্ষা আর শ্রম খাত নিয়ে। কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার, জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয়, মিড-ডে মিল, ডিজিটাল ক্লাসরুম- এগুলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। ক্যাম্পাসগুলোতে ২০২৪-এর অস্থিরতার পর এখন ক্লাস-পরীক্ষা নিয়মিত। কিন্তু থেমে গেলে চলবেবিধা নেই। ইউজিসির হিসাব বলছে গবেষণায় বরাদ্দ জিডিপির ০.৪ শতাংশের নিচে। ল্যাব, লাইব্রেরি, আবাসন, শিক্ষক- এখানে এখনই গুচ্ছ প্রকল্প দরকার। শ্রম মন্ত্রণালয়ের দুই দফা পরিকল্পনার জন্য চাই টাকা আর কড়া পর্যবেক্ষণ।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু টিআইবির মূল্যায়ন বলছে, এখনো অনেক মন্ত্রণালয়ে সিন্ডিকেটের ছায়া রয়ে গেছে। ছোট দুর্নীতি ধরলে হবে না, বড় প্রকল্প, ব্যাংক ঋণ, নিয়োগ- এখানে স্বচ্ছতার আয়না ধরতে হবে।
পররাষ্ট্রে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক আবেগ নয়, স্বার্থ দিয়ে মাপতে হবে। গণমাধ্যম বলছে সরকারি চাপ কমেছে, তাই সাংবাদিকদের লেখার স্বাধীনতা প্রশ্নাতীত রাখতে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।
নতুন সরকারের ১৮০ দিন ছিল প্রস্তাবনার সময়। প্রস্তাবনা ভালো হয়েছে। কিন্তু মানুষ এখন প্রস্তাবনা চায় না, ফল চায়। তিনটি জিনিস- নিরাপদ জীবন, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, কাজের সুযোগ। এই তিনটি সুযোগ বাস্তবায়ন করতে পারলেই বিএনপি সরকার জনগণের আস্থার নৌকা টেনে নিতে পারবে।
ছয় মাসে সরকারের শুভ সূচনা হয়েছে। কিন্তু পথ এখনো দীর্ঘ। পথ চলতে গেলে পথের ধুলো পায়ে লাগবেই। তবে পা যদি শক্ত থাকে, আর চোখ যদি মানুষের দিকে থাকে- তবে আলো আসবেই।
লেখক: অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
