
দুপুর দেড়টা। বাঁশখালী উপজেলা পরিষদের পুকুরে বড় জাল পড়েছে। টান পড়তেই ঘোলা হয়ে উঠল জল- রুই, কাতলাসহ নানা প্রজাতির মাছ ছটফট করতে করতে উঠে আসছে জালের বুকে। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন ও সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌসিব উদ্দিন। কৌতূহলী মানুষও জমে উঠেছে চারপাশে।
একে একে মাছ ভরা হলো ড্রামে। তারপর সেই ড্রাম গেল কোথায়? এতিমখানায়? অসহায় পরিবারের দরজায়?- না। অভিযোগ উঠেছে, উপজেলা প্রশাসনের ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে সরকারি পুকুরের সেই মাছ।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি জানাজানি হতেই বাঁশখালীজুড়ে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা।
সরকারি অর্থের মাছ, বেসরকারি ভাগ্য
উপজেলা পরিষদের এই পুকুরে প্রতিবছর বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের (এডিপি) বরাদ্দ থেকে মাছের পোনা ছাড়া হয়। অর্থাৎ পুকুরের মাছ সরকারি সম্পদ। পোনামাছ অবমুক্তি নির্দেশিকা অনুযায়ী এই মাছ উত্তোলনের পর কমপক্ষে ১০ শতাংশ গরিব, দুঃস্থ ও এতিমখানায় বিতরণের কথা।
কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের দাবি, প্রশাসনের কর্মচারী ও আনসার সদস্যদের পাহারায় মাছভর্তি ড্রাম নেওয়া হয় ইউএনওর সরকারি বাসভবনের সামনে। সেখান থেকে পুকুরের উত্তর পাশের ঘাটে ভাগ করে দেওয়া হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মচারী বলেন, “ইউএনওর নির্দেশেই পুকুর থেকে মাছ তোলা হয়। পরে ২৪ জনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। ইউএনও নিজেই মাছ ভাগ করে দেন।”
উপজেলা প্রশাসনের আরেক কর্মচারী মো. ছাদেক অবশ্য এতে দোষের কিছু দেখছেন না। তাঁর কথায়, “ইউএনও স্যার অনেক ভালো মানুষ। তিনি আমাদের সবাইকে মাছগুলো বণ্টন করে দিয়েছেন।”
‘এখানে সবার হক আছে’- ইউএনওর ব্যাখ্যা
অভিযোগের মুখে ইউএনও রুহুল আমিন নিজেই মাছ তোলা ও বণ্টনের কথা স্বীকার করেছেন, তবে দিয়েছেন ভিন্ন ব্যাখ্যা।
তিনি বলেন, “পানিতে বিষক্রিয়ায় মাছ বেশি ভেসে উঠছিল। মাছ ভেসে না ওঠার জন্য লবণসহ কিছু সরঞ্জাম পানিতে মেশানো হয়। মৎস্য কর্মকর্তার উপস্থিতিতে এটা করা হয়েছে। এটা প্রাতিষ্ঠানিক পুকুর। এখানে সবার হক আছে। তাই মাছ তুলে সবাইকে বণ্টন করে দিয়েছি।”
কিন্তু ‘সবার হক’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে- সরকারি কর্মকর্তাদের, নাকি যাদের জন্য সরকারি নীতিমালায় এই মাছ রাখার কথা, সেই গরিব ও এতিমদের? এই প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর মেলেনি।
দায় নিলেন না মৎস্য কর্মকর্তা
ঘটনায় নিজের ভূমিকা সীমিত বলে দাবি করেছেন সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌসিব উদ্দিন। তিনি বলেন, “এটা সম্পূর্ণ ইউএনও সাহেবের ব্যবস্থাপনায় হয়েছে। আমি মসজিদে নামাজ পড়ে বের হয়ে মাছ ধরার দৃশ্য দেখেছি। কী পরিমাণ মাছ পাওয়া গেছে, কাদের মধ্যে বণ্টন হয়েছে- কিছুই জানি না। আমার কোনো ভূমিকা নেই।”
অথচ প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, মাছ তোলার সময় মৎস্য কর্মকর্তাকে পুকুরপাড়েই দেখা গেছে। দুজনের বক্তব্যের এই ফারাক নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
‘এই ধরনের ঘটনা কোনো দিন শুনিনি’
পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্য দেখা স্থানীয় বাসিন্দা চৌধুরী জসীমুল হক বলেন, “সরকারি পুকুরের মাছ এতিমখানা ও গরিব-দুঃখীদের বঞ্চিত রেখে স্টাফদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক ও বিবেকবর্জিত। এমন ঘটনায় প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।”
চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলামও ঘটনাটিকে অভূতপূর্ব বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “এই ধরনের ঘটনা আমি কোনো সময় শুনিনি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুকুরেও এমন নজির নেই। দায়িত্বশীল অফিসার কখনো এই ধরনের কাজ করতে পারে না।”
তিনি জানান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালীন তিনি পুকুরটি লিজ দিতেন। সেই টাকা জমা হতো পরিষদের মসজিদের ফান্ডে।
জবাবদিহি কোথায়?
সরকারি অর্থে পালা মাছ। সরকারি নিয়মে সেই মাছ পাওয়ার কথা দুঃস্থদের। কিন্তু গেল কর্মকর্তাদের ঘরে। প্রশ্ন এখন অনেক- মাছের প্রকৃত পরিমাণ কত ছিল? বিষক্রিয়ার যে কারণ দেখানো হয়েছে, তা কি সত্য? সরকারি বিধি অনুযায়ী এই মাছ বণ্টন হয়েছে কি না? এর কোনো স্বচ্ছ হিসাব কি রাখা হয়েছে?
স্থানীয়রা এখন তদন্তের দাবি তুলেছেন।
