খেলাপি ঋণ ছয় লাখ কোটি ছাড়াল, বিশ্বে শীর্ষে বাংলাদেশ


ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর ফলে খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে ইউক্রেনকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সব দেশের মধ্যে শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা।

এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ (সূচকের হিসাবে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ)।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এই খেলাপি ঋণের বড় অংশ হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনঃতপশিল, বিশেষ ছাড় ও হিসাবগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ঋণ নিয়মিত দেখানো হয়েছিল।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আনার ওপর জোর দেয়। ফলে আগে আড়ালে থাকা বিপুল ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়।

তবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোরতার পরিবর্তে আবারও একের পর এক ছাড় দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং বিশ্বব্যাংকের খেলাপি ঋণ সূচক অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের পর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মধ্য আফ্রিকার দেশ চাদ। দেশটির খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ।

তালিকায় এরপরই রয়েছে ইকুয়েটোরিয়াল গিনি (৩০ শতাংশ), আলজেরিয়া (২০ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ) এবং ঘানা (১৮ দশমিক ১১ শতাংশ)।

এর আগে খেলাপি ঋণের তালিকায় দীর্ঘ সময় ধরে শীর্ষে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। লিগা ডট নেট ও ফিন্যান্সিয়াল ক্লাবের তথ্যমতে, রাশিয়ার হামলার পর তাদের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৯ শতাংশে উঠেছিল।

তবে ঋণ আদায় ও পুরোনো ঋণ অবলোপনের মাধ্যমে তারা এই হার দ্রুত কমিয়েছে। ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের ১ জুলাই দেশটির খেলাপি ঋণের হার ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে, অর্থাৎ ১২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ব্যাংক প্রিভাতব্যাংকসহ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বিপুল পরিমাণ পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে।

এসব অর্থ উদ্ধারে ইউক্রেনের পাশাপাশি লন্ডন, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলে আইনি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রিভাতব্যাংক।

বাংলাদেশে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। নানা ছাড়ের কারণে তা বাড়তে বাড়তে ২০২৩ সাল শেষে এক লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকায় ওঠে।

দেশে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণ ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় ২০২৫ সালের জুনে। পরের প্রান্তিকে তা রেকর্ড ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় উঠলেও বছরের শেষে কিছুটা কমে আসে।

তবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তা ফের ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বেড়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক, যাদের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি।

উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমায় ২০২৬ সালের জন্য লভ্যাংশ দেওয়ার নিয়ম আরও কড়াকড়ি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তবে একই সময়ে হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছর মেয়াদে পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান না করেই বন্ধ কারখানা সচলের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।