
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উদ্যোগে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। তবে এই দরজা দিয়ে ঢোকার আগে আমাদের পা কোথায় ফেলছি, সে হিসাবটাও রাখতে হবে। উৎসাহের সঙ্গে বাস্তবতার ভারসাম্য না থাকলে সুযোগ একসময় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। জোটের সুফল নিতে হলে আবেগ নয়, কৌশল আর সতর্কতাই হতে হবে মূল পুঁজি।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উদ্যোগে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে একে ‘মুসলিম ন্যাটো’ নাম দিলেও, জোটের রূপরেখা ও লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি আক্রমণাত্মক কোনো সামরিক জোট নয়, বরং সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো।
এই প্রেক্ষাপটে জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তাকে আমরা ইতিবাচকভাবেই দেখি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক অবস্থান এবং সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। আমাদের মতে, সঠিক শর্ত সাপেক্ষে এই জোটে যোগ দেওয়াই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল।
তুরস্কের হাসান কালিয়ানকু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুরাত আসলামের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই চুক্তির কোনো নির্দিষ্ট শত্রু দেশ নেই। এর মূল উদ্দেশ্য সদস্যদের মধ্যে যুদ্ধ পরিহার এবং সম্মিলিতভাবে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো। ন্যাটোর মতো এখানে কোনো স্থায়ী কমান্ড স্ট্রাকচার বা ‘একজন আক্রান্ত হলে সবাই যুদ্ধে যাবে’ – এমন বাধ্যবাধকতা নেই। অতীতে সৌদি আরব আক্রমণের শিকার হলেও পাকিস্তানকে যুদ্ধে জড়াতে হয়নি- এই উদাহরণই প্রমাণ করে জোটটি নমনীয় ও বাস্তবসম্মত।
বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। একবিংশ শতাব্দীর নিরাপত্তা শুধু সীমান্তে টহল দিয়ে হয় না। সাইবার নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, দুর্যোগ মোকাবিলা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা- সব ক্ষেত্রেই এই জোট সহযোগিতার পথ খুলে দিতে পারে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক হাসিব আজিজ যথার্থই বলেছেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের যৌথ সামরিক সক্ষমতা বাড়ার বড় সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই তুরস্ক থেকে বায়রাক্তার ড্রোন ও অটোকার কোবরা যানবাহন আমদানি করছে। জোটের সদস্য হলে এই সহযোগিতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ উৎপাদন ও প্রশিক্ষণের সুযোগ আসবে। এর ফলে প্রতিরক্ষা ব্যয় কমবে এবং দেশীয় শিল্পে দক্ষতা বাড়বে।
একইসাথে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান- তিনটি বড় অর্থনীতির সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক আরও গভীর হবে। সৌদি আরবে আমাদের ৩০-৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। তুরস্কে বিনিয়োগ বাড়ছে। এই জোট সেই অর্থনৈতিক সম্পর্ককে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ছাতা দেবে। অধ্যাপক আসলামও জোটের বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কথা বলেছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, এটি মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়, অত্যন্ত সময়োপযোগী। বিশ্ব এখন ব্লকে বিভক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব’ নীতি বজায় রাখতে হলে আমাদের একাধিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকতে হবে। মক্কা জোট তেমনই একটি প্ল্যাটফর্ম। এখানে যোগ দিলে বাংলাদেশ পশ্চিমা ব্লক বা অন্য কোনো শক্তির ওপর এককভাবে নির্ভরশীলতা কমাতে পারবে। একইসাথে ১৮ কোটি মানুষের দেশ হিসেবে আমরা জোটের মধ্যে নেতৃত্বের ভূমিকা রাখার সুযোগ পাব।
সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, জোটে যোগদানের বিষয়টি নির্ভর করছে বর্তমান সদস্যদের অভিপ্রায়ের ওপর; তারা আমন্ত্রণ জানালে বাংলাদেশ তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। এটি মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয় হওয়ায় অন্যদের উদ্বেগের কোনো অবকাশ নেই।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, পাকিস্তান সদস্য থাকায় ভারতের প্রতিক্রিয়া কী হবে? ভবিষ্যতে কোনো সংঘাতে বাংলাদেশ জড়িয়ে পড়বে কি না? আমাদের উত্তর: ভারত-পাকিস্তান প্রশ্নে ভয় নয়, কৌশল চাই আমরা। ভয় পেয়ে সিদ্ধান্ত নয়, কৌশল দিয়ে এগোতে হবে। ভারত আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী রাষ্ট্র। কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকতে হবে অন্যান্য দেশের তুলনায় অধিক সম্মানজনক। যেহেতু মক্কা যৌথ চুক্তিভিত্তিক জোটে স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধে জড়ানোর বাধ্যবাধকতা নেই, তাই বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত থাকবে। বরং জোটের সদস্য হলে বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের সাথেই সংলাপের সেতু হতে পারবে। এটি আমাদের কূটনৈতিক মর্যাদাই বাড়াবে, কমাবে না।
সরকার যদি জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে নিম্নলিখিত তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথমত, স্বেচ্ছাভিত্তিক অংশগ্রহণ। কোনো আক্রমণাত্মক যুদ্ধে বাংলাদেশকে বাধ্য করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি হস্তান্তর। সদস্যপদের বিনিময়ে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক প্যাকেজ। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শ্রমবাজারের সুবিধা চুক্তির অংশ করতে হবে।
সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতা এবং ঝুঁকিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
এক. ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ভারসাম্য নষ্ট না হয় সেদিকটা সবচেয়ে বিবেচ্য বিষয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার ভারত ও চীন। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের প্রধান রপ্তানি বাজার। মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার অজুহাতে যদি এই তিন পক্ষের সাথে সম্পর্কে ফাটল ধরে, তবে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে। আমাদের কূটনীতিকে হতে হবে ‘প্লাস ওয়ান’- নতুন জোট, কিন্তু পুরনো বন্ধু বাদ নয়।
দুই. অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাবের সুযোগ যেন তৈরি না হয় তাও বিবেচনায় রাখতে হবে। ‘মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ — এই ব্যাখ্যা কূটনৈতিকভাবে ঠিক। কিন্তু দেশের ভেতরে যেন একে ‘ধর্মীয় ব্লক’ হিসেবে রাজনৈতিক ফায়দার হাতিয়ার বানানো না হয়। জোটটি রাষ্ট্রের, কোনো দলের নয়। সিদ্ধান্ত নিতে হবে জাতীয় ঐকমত্য ও সংসদীয় বিতর্কের ভিত্তিতে।
তিন. প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবায়নের ফাঁক কী, তাও এখানে বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ চুক্তি কাগজে সবসময় সুন্দর হয়, বাস্তবে কতটা কার্যকর তা দেখার বিষয়। সদস্য হলেই প্রযুক্তি আসবে, বিনিয়োগ আসবে- এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই যোগ দেওয়ার আগেই রোডম্যাপ চাইতে হবে। কোন খাতে কত বিনিয়োগ, কোন প্রযুক্তি কবে হস্তান্তর- সব লিখিত হতে হবে। নইলে আমরা নামসর্বস্ব সদস্য হয়ে থাকব।
আমরা বিশ্বাস করতে চাই, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কোনো ধর্মীয় জোট নয়, এটি একটি বাস্তববাদী নিরাপত্তা ও উন্নয়ন জোট। বিশ্ব পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনে বাংলাদেশ যদি নীরব দর্শক হয়ে থাকে, তবে আমরা পিছিয়ে পড়ব। আমিরুন্নেছার মতো সাধারণ মানুষ যেন সড়ক অব্যবস্থাপনার শিকার না হয়, সেজন্য যেমন রাস্তা ঠিক করতে হয়, তেমনি জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনীতির রাস্তাও সময়মতো প্রশস্ত করতে হয়।
তবে রাস্তা প্রশস্ত করতে গিয়ে যেন পুরনো শক্ত ভিতের সেতু ভেঙে না পড়ে, সেটাও দেখতে হবে। সরকারের উচিত দ্রুত, স্বচ্ছ ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে, উপরোক্ত সতর্কতাগুলো মাথায় রেখে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া। উন্নয়নের সাথে নিরাপত্তা, আর নিরাপত্তার সাথে সম্মান- এই ত্রয়ী নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাক্তন সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।
