
শুক্রবার রাত ১টা পর্যন্ত প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্প করলেন মৌসুমী হিজড়া। হাসিমুখে বিদায় নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলেন ঘুমাতে। ভোররাতে পাশের কক্ষের বাসিন্দারা তার ঘর থেকে বাকবিতণ্ডার শব্দ শুনলেন- ভাবলেন পরিচিত কেউ হবে, তাই গুরুত্ব দিলেন না।
কিন্তু সকাল ১০টায় ডাকতে গিয়ে যা দেখলেন, তাতে হতবাক হয়ে গেলেন সবাই। বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে আছেন মৌসুমী, মুখ দিয়ে বের হচ্ছে রক্ত, জিহ্বা বের হয়ে আছে বাইরে। চট্টগ্রামের হিজড়া সম্প্রদায়ের পরিচিত ‘গুরুমা’ আর নেই- রাতের আঁধারে কেউ তার জীবন কেড়ে নিয়েছে।
তিন ঘণ্টার রহস্যময় যুবক
চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার আমবাগান রেলওয়ে কলোনি সংলগ্ন হিজড়া কলোনির বাসা থেকে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মোহাম্মদ মহসীন ওরফে মৌসুমী হিজড়ার (৫২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার গলায় ছিল গুরুতর জখমের চিহ্ন, একটি চোখ ফোলা এবং মুখে রক্তের দাগ।
প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, তাকে মারধরের পর শ্বাসরোধে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া সিসিটিভি ফুটেজ। ফুটেজে দেখা গেছে, সাদা টি-শার্ট পরা এক যুবক শুক্রবার রাত ১টা ১৪ মিনিটে মৌসুমীর কক্ষে প্রবেশ করে এবং রাত ৩টা ৫২ মিনিটে বের হয়ে যায়।
অর্থাৎ প্রায় তিন ঘণ্টা সে ওই কক্ষে ছিল। মৌসুমী নিজেই দরজা খুলে ওই যুবককে ভেতরে নিয়েছিলেন, যা থেকে পুলিশের ধারণা, সে মৌসুমীর পূর্ব পরিচিত। তবে হিজড়া সম্প্রদায়ের কেউই তাকে চিনতে পারছেন না।
খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিম বলেন, “ওই যুবকের ঘরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ আমরা সংগ্রহ করেছি। তাকে গ্রেফতার করতে পারলে হত্যার রহস্য উদঘাটন হবে।”
টাকা লুটের উদ্দেশ্যে হত্যা, তদন্তে নতুন মোড়
পুলিশ জানায়, শুক্রবার মৌসুমীর বাসার পেছনের গরুর খামার থেকে একটি গরু বিক্রি করা হয়েছিল। সেই বিক্রির টাকা মৌসুমীর কাছেই রাখা ছিল। শনিবার সকালে আরেকটি গরু কিনতে যাওয়ার কথা ছিল তার।
কিন্তু ঘটনার পর দেখা গেছে, সেই টাকা এবং তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোনের কোনো হদিস নেই। এই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সন্দেহ করছে, অর্থ লুটের উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা রুস্তম আলী বাদী হয়ে রোববার খুলশী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মৌসুমীর বাড়ি ছিল কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার মুনপুর গ্রামে।
মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে হিজড়া সম্প্রদায়ের লোকজন ঘটনাস্থলে জড়ো হন এবং হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
হিজড়া পাখি রহমান বলেন, “সকাল ১০টার দিকে ঘরে ঢুকে দেখি তার মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে, জিহ্বা বের হয়ে আছে। তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।”
খুলশী থানার উপপরিদর্শক গোলাম মোহাম্মদ নাসিম জানান, মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং সন্দেহভাজন যুবককে গ্রেপ্তারে পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
