পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ, দুই দিন পর মামলায় নাম


চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এক কৃষক ও উদ্যোক্তা পুলিশের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ করে সংবাদমাধ্যমে কথা বলার পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আসামি হয়েছেন। তাঁর দাবি, ঘুষ দাবির অভিযোগ প্রকাশের জেরে তাঁকে প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, মামলায় আসামি হওয়া মানেই তিনি অপরাধী- এমন নয়; তদন্তে তাঁর সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া গেলে বিষয়টি সে অনুযায়ী দেখা হবে।

নুরুল আলম (৪৫) নামের ওই কৃষক বাঁশখালীর পুকুরিয়া ইউনিয়নের চন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি নিজের খামারে চুরির ঘটনায় করা মামলার তদন্তে ঘুষ দাবির অভিযোগ তুলেছিলেন রামদাস মুন্সির হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) সুমন কবির মৃধার বিরুদ্ধে। তাঁর অভিযোগ, ওই কর্মকর্তা তদন্তের অনুকূলে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলে দুই দফায় তাঁর কাছ থেকে মোট ৪ হাজার ৫০০ টাকা নেন। পরে আরও ৫ হাজার টাকা দাবি করেন।

ঘুষ দাবির অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর গত ২৮ আগস্ট এসআই সুমন কবির মৃধাকে প্রত্যাহার করে চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। এর দুই দিন পর, ৩০ আগস্ট আনোয়ারা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় নুরুল আলমকে ৫২ নম্বর আসামি করা হয়। এই ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

নুরুল আলমের দাবি, সংবাদ প্রকাশের পর তাঁকে নাশকতা বা রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এরপরই আনোয়ারার বরুমছড়া রাস্তার মাথা এলাকায় একটি ঘটনার মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়। ঘটনার সময় তিনি সেখানে ছিলেন না দাবি করে তিনি নিজের মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশন ও কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।

এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত, ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ যাচাই, মামলায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি খতিয়ে দেখা এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কমপ্লেইন সেলে লিখিত আবেদন করেছেন নুরুল আলম। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) তিনি আবেদনটি করেন। এর আগে বুধবার চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের কাছেও লিখিত অভিযোগ দেন।

চুরির মামলা থেকে ঘুষের অভিযোগ

নুরুল আলমের নিজের খামারের নাম ‘জামশেদ এক্সপ্রেস ডেইরি অ্যান্ড এগ্রো ফার্ম’। তাঁর অভিযোগ, গত ৭ জুলাই রাতে সেখানে চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে ২৬ জুলাই বাঁশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর মামলা করেন তিনি।

আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দেন। পরে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় রামদাস মুন্সির হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই সুমন কবির মৃধাকে।

নুরুল আলম তাঁর লিখিত অভিযোগে বলেন, তদন্তের অনুকূলে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলে সুমন কবির মৃধা তাঁর কাছে টাকা দাবি করেন। একপর্যায়ে তিনি দুই দফায় মোট ৪ হাজার ৫০০ টাকা দেন। এরপরও ‘ওসি স্যারকে দিতে হবে’ বলে আরও ৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়।

এই অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর ২৮ আগস্ট সুমন কবির মৃধাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়।

দুই দিন পরই নতুন মামলায় নাম

পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ প্রকাশের দুই দিন পর, ৩০ আগস্ট আনোয়ারা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা হয়। ওই মামলায় ৫২ নম্বর আসামি হিসেবে নুরুল আলমের নাম রয়েছে।

নুরুল আলমের অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশের পর তাঁকে নাশকতা বা রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এর সঙ্গে নতুন মামলায় তাঁর নাম আসার সময়ের মিলকে তিনি প্রতিহিংসার আশঙ্কার কারণ হিসেবে দেখছেন।

তবে এই দুই ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে- এমন প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। বিষয়টি তদন্তাধীন।

নুরুল আলম আরও দাবি করেন, আনোয়ারা থানার মামলার বাদী এসআই ইমাম হোসেন এবং ঘুষ দাবির অভিযোগে প্রত্যাহার হওয়া এসআই সুমন কবির মৃধা একই ব্যাচের কর্মকর্তা এবং তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। এই সম্পর্কের কারণে তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।

‘ঘটনার সময় খামারে ছিলাম’

নুরুল আলমের দাবি, ৩০ আগস্ট আনোয়ারার বরুমছড়া রাস্তার মাথা এলাকায় যে ঘটনা কেন্দ্র করে মামলা হয়েছে, তার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তিনি তখন নিজের খামারে ছিলেন।

এ দাবির সত্যতা যাচাইয়ে নিজের মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশন ও সিডিআর পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে এসআই সুমন কবির মৃধা ও মামলার বাদী এসআই ইমাম হোসেনের সাম্প্রতিক কল রেকর্ডও পর্যালোচনার অনুরোধ করেছেন।

তাঁর ভাষ্য, এসব ডিজিটাল তথ্য পরীক্ষা করা হলে মামলায় তাঁর নাম কীভাবে এসেছে এবং ঘটনার সময় তাঁর অবস্থান কোথায় ছিল- তা যাচাই করা সম্ভব।

পুলিশ যা বলছে

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও আনোয়ারা থানার এসআই ইমাম হোসেন বলেন, মামলাটির তদন্ত মাত্র শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘তদন্ত তো শেষ হয়নি এখনও। উনি (নুরুল আলম) যদি কৃষক হয়ে থাকেন, ঘটনার সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা না থাকে, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে বিষয়টি দেখা হবে।’

সুমন কবির মৃধাকে তিনি চেনেন কি না- জানতে চাইলে ইমাম হোসেন বলেন, ‘সুমন কবির মৃধা নামের কাউকে আমি চিনি না।’

রামদাস মুন্সির হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. দুলাল হোসেন বলেন, সুমন কবির মৃধার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে নুরুল আলমকে ক্ষোভের কারণে আসামি করার অভিযোগ সঠিক নয়।

তিনি বলেন, ‘সুমন কবির মৃধা অপরাধ করেছেন, তাঁর শাস্তি হয়েছে। ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে আসামি করার বিষয়টি সঠিক নয়। নুরুল আলম নামের কাউকে আমি চিনি না।’

বাঁশখালী থানার ওসি রবিউল হক বলেন, ‘মামলা তো আমার থানায় হয়নি। এটা আনোয়ারা থানায় হয়েছে। আনোয়ারা থানা থেকে লিখিত চাইলে আমরা সেটা দেব।’

ঘুষ দাবির অভিযোগ ও নতুন মামলায় নুরুল আলমের নাম আসার বিষয়ে জানতে এসআই সুমন কবির মৃধাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

‘আসামি হওয়া মানে অপরাধী হয়ে যাওয়া নয়’

সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান বলেন, ওই মামলার বেশির ভাগ আসামিই বাঁশখালীর বাসিন্দা। তাঁর ভাষ্য, বাঁশখালী থেকে গিয়ে একটি মিছিল করার অভিযোগ রয়েছে।

নুরুল আলমের মামলায় আসামি হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মামলায় আসামি হওয়া মানে এই নয় যে উনি সেখানে ছিলেন। এটি তদন্তের ব্যাপার-স্যাপার।’

এসআই ইমাম হোসেন ও সুমন কবির মৃধা একই ব্যাচের কর্মকর্তা কি না- এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইমাম হোসেন সুমন কবির মৃধার ব্যাচম্যাট হতেই পারে। কিন্তু ওটার সঙ্গে এটার কানেকশন দেখছি না।’

তাঁর ভাষ্য, ‘অনেকেই আসামি হতে পারে, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে যে চার্জশিট হবে, তা নয়।’

নুরুল আলমের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি দেখবেন বলেও জানান তিনি।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, নুরুল আলম লিখিত অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি তদন্তের জন্য আনোয়ারা সার্কেলকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ‘আসামি হওয়া মানে উনি অপরাধী হয়ে গেলেন, তা নয়। নুরুল আলম নামের ওই ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ করেছেন। এখন বিষয়টি তদন্ত করার জন্য আনোয়ারা সার্কেলকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হবে। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তদন্তে এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন

নুরুল আলমকে মামলায় আসামি করার পেছনে কী তথ্য বা প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য রয়েছে, তা তদন্তেই স্পষ্ট হওয়ার কথা। একই সঙ্গে তাঁর করা অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।

বিশেষ করে ঘটনার সময় তাঁর মোবাইল ফোনের অবস্থান, মামলায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি, এজাহার তৈরির আগে ও পরে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের যোগাযোগ এবং ঘুষ দাবির অভিযোগের প্রমাণ- এসব যাচাই করা গেলে ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।

নুরুল আলমের দাবি, এসব তথ্য-প্রমাণই তিনি পুলিশের কাছে যাচাইয়ের অনুরোধ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, তিনি অপরাধে জড়িত না থাকলে তদন্তের মাধ্যমেই তা প্রমাণিত হোক।

অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। এখন দেখার বিষয়, নুরুল আলমের অভিযোগ ও মামলায় তাঁর অন্তর্ভুক্তি- দুই বিষয়েই তদন্ত কতটা স্বাধীন ও তথ্যনির্ভর হয়।