
দুবাইপ্রবাসী এক বাড়িওয়ালা হয়তো জানতেনই না, তাঁর চট্টগ্রামের বাড়িতে কী চলছে। দেড় মাস আগে ভাড়া নেওয়া সেই আটতলা ভবনের ভেতরে তখন সাজানো ছিল এক অদৃশ্য জালের কারখানা। সারি সারি ল্যাপটপ, স্তূপ করা মোবাইল ফোন- আর সেগুলোর পর্দায় চলছিল নিরন্তর প্রতারণার খেলা।
গত বৃহস্পতিবার বিকালে সেই জালে টান দিল পুলিশ। খুলশীর জালালাবাদ কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের ওই ভবনে অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও খুলশী থানা পুলিশ গ্রেফতার করল পাঁচ দেশের ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে।
যেভাবে উন্মোচিত হলো চক্র
বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা ৫০ মিনিট। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের বিশেষায়িত দল খুলশী থানা পুলিশের সহায়তায় ভবনটিতে অভিযান শুরু করে। ভেতরে পাওয়া যায় চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের ৬৩ জন নাগরিক।
শুক্রবার বিকালে সিএমপির দামপাড়া পুলিশ লাইনসের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ জানান, গ্রেফতার ব্যক্তিরা প্রায় দেড় মাস আগে ভবনটি ভাড়া নেয়। এরপর থেকে সেখানে অবস্থান করে সংঘবদ্ধভাবে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।
অপরাধের হাতিয়ার যা পাওয়া গেল
ভবনটি থেকে উদ্ধার হওয়া সরঞ্জামের তালিকা দীর্ঘ। পুলিশ জব্দ করেছে —
– বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১৩৪টি মোবাইল ফোন
– বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৫৭টি ল্যাপটপ
– একটি অ্যাপল ট্যাব
– একটি সিপিইউ, একটি স্যামসাং মনিটর, একটি কিবোর্ড, একটি মাউস ও একটি প্রিন্টার
– পাঁচটি পেনড্রাইভ ও চারটি সিমকার্ড
– তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র ও একটি কম্বোডিয়ান কর্মসংস্থান কার্ড
পুলিশ জানিয়েছে, এই বিপুল পরিমাণ ডিভাইস ব্যবহার করেই চক্রটি তাদের অনলাইনভিত্তিক অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করত।
কী ধরনের অপরাধ চলছিল
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ফয়সাল আহম্মেদ জানান, গ্রেফতার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া বাসায় অবস্থান করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ —
– তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সংঘবদ্ধ আর্থিক প্রতারণা ও জালিয়াতি
– অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ
– আইনি কর্তৃত্বের বাইরে ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে অপরাধমূলক কার্যক্রম
দেশি-বিদেশি সহযোগী এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে
সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে তা হলো, এই চক্রের সঙ্গে দেশীয় ও বিদেশি কয়েকজন সহযোগীও জড়িত। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এসব সহযোগীর কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি এখনও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন।
বাংলাদেশে এই চক্রের কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালাতে সহায়তা করাই ছিল তাদের কাজ। তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
তদন্তের মুখোমুখি যে প্রশ্নগুলো
জব্দ করা ডিভাইসগুলোর তথ্য এখন বিশ্লেষণ করছেন তদন্তকারীরা। পুলিশের আশা, এতে চক্রটির কর্মকাণ্ড, দেশি-বিদেশি সহযোগী এবং প্রতারণার বিস্তার সম্পর্কে আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে।
কিন্তু বড় প্রশ্নগুলো এখনও অনুত্তরিত-
পাঁচ দেশের ৬৩ জন বিদেশি নাগরিক কীভাবে বাংলাদেশে এলেন? কোন ভিসায়? কারা তাদের এনেছে? দেড় মাস ধরে একটি আবাসিক এলাকায় এত মানুষের সন্দেহজনক কার্যক্রম স্থানীয়ভাবে কেউ টের পাননি? নাকি জানলেও জানাননি?
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, “চক্রটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হবে।”
