দুইশো বছর ধরে এক টেবিলে সবাই


রাত তখন গভীর হচ্ছে। কিন্তু ফটিকছড়ির গোপালঘাটা গ্রামে ঘুমের নাম নেই। কালা গাজী শাহ জামে মসজিদের প্রাঙ্গণজুড়ে আলোর রোশনাই। দীর্ঘ সারিতে পাতা টেবিল। এক পাশে বসেছেন সাদা পাঞ্জাবি পরা বয়স্ক কৃষক, পাশেই টাই পরা শহুরে ব্যবসায়ী। একটু দূরে স্কুলপড়ুয়া কিশোর, তার পাশে সত্তর পেরোনো বৃদ্ধ।

কেউ কারো পরিচয় জিজ্ঞেস করছেন না। কেউ দেখছেন না কে ধনী, কে গরিব। একজন আরেকজনের থালায় খাবার তুলে দিচ্ছেন, পানি এগিয়ে দিচ্ছেন। খাওয়া শেষে নিজেই প্লেট সরিয়ে রাখছেন।

এই দৃশ্য নতুন নয়। তবে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাতের এই ছবিটি ছিল বিশেষ- দুইশো বছর ধরে প্রতি বছর পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (স.)-এর রাতে এভাবেই একাকার হয়ে যান ফটিকছড়ির মানুষ।

এক প্রাঙ্গণে দশ হাজার মানুষ

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার গোপালঘাটা গ্রামের কালা গাজী শাহ জামে মসজিদ। গ্রামের সাধারণ একটি মসজিদ হলেও প্রতি বছর ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) উপলক্ষে এটি পরিণত হয় এক অসাধারণ মিলনক্ষেত্রে।

দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের শেষ দিনে আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ ছুটে আসেন এই প্রাঙ্গণে। কেউ আসেন হাতে খাবার নিয়ে, কেউ আসেন সেবা করতে, কেউ বা আসেন শুধু এই মিলনমেলার অংশ হতে। প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষের জন্য খাবারের আয়োজন হয় এখানে।

কিন্তু সংখ্যাটা এই আয়োজনের আসল পরিচয় নয়। আসল পরিচয় হলো- এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই। ধনী-গরিব, কৃষক-শ্রমিক, ব্যবসায়ী-চাকরিজীবী, সবার পরিচয় এখানে একটাই। তাঁরা এই আয়োজনের অতিথি।

খাবার পরিবেশনে নেই কোনো সংকোচ

এই আয়োজনের সবচেয়ে অনন্য দিক হলো খাবার পরিবেশনের ধরন। কোনো পেশাদার সেবক নেই। নেই আলাদা কোনো বিভাজন। যিনি এইমাত্র খেয়েছেন, তিনিই পরমুহূর্তে অন্যজনের থালায় খাবার তুলে দিচ্ছেন। যিনি সমাজে প্রতিষ্ঠিত, তিনিই অনায়াসে পানির গ্লাস এগিয়ে দিচ্ছেন পাশের মানুষটির দিকে।

খাওয়া শেষে প্লেট পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে প্রাঙ্গণ পরিষ্কার রাখা- সব কাজেই দেখা মেলে স্বেচ্ছাসেবার এক নিখুঁত ছবি। অহংকার সরিয়ে রেখে সবাই যেন একই পরিবারের সদস্য হয়ে যান এই রাতটুকুর জন্য।

পুরুষদের পাশাপাশি শিশু ও বৃদ্ধদের উপস্থিতিও এই আয়োজনকে দেয় পারিবারিক উষ্ণতা। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে হাজির হন শুধু এই ঐতিহ্যের অংশ হতে। আর যে নারীরা প্রাঙ্গণে আসতে পারেন না, তাদের জন্য দিনের বেলায় বাড়িতে পৌঁছে যায় টিফিনবক্স ভর্তি খাবারের থলে। ফলে ঘরে বসেও তাঁরা হয়ে ওঠেন এই আয়োজনের অংশ।

দুইশো বছর পেরিয়েও অটুট

সময় বদলায়। মানুষের জীবন বদলায়, সমাজের কাঠামো বদলায়। আধুনিকতার ঢেউয়ে ভেসে যায় বহু পুরোনো রীতি। কিন্তু গোপালঘাটার এই আয়োজন থেকে যায় অবিচল।

দুইশো বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ঐতিহ্য বহন করে আসছেন। দাদার কাছ থেকে বাবা, বাবার কাছ থেকে ছেলে- এভাবেই টিকে আছে এই সম্প্রীতির আলো।

মিলাদুন্নবী উদযাপন কমিটির সভাপতি ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জয়নাল আবেদিন মুহুরী বলেন, “সময়ের স্রোতে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও প্রতিবছর এই পুরোনো দৃশ্য আমাদের আপ্লুত করে। কোলাকুলি, একই টেবিলে আপ্যায়ন, সেবা ও ভেদাভেদ ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়ানোটাই সবার লক্ষ্য। গ্রামের মানুষ এই আয়োজনকে তাদের পরম মমতায় আপন করে নিয়েছেন।”

যে বার্তা দুইশো বছর ধরে বলে আসছে এই আয়োজন

ফটিকছড়ির এই আয়োজন শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটি একটি বার্তা- মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদমর্যাদায় নয়, তার সামাজিকতায়। এক টেবিলে বসে খাওয়া, একে অপরের হাতে খাবার তুলে দেওয়া- এই ছোট ছোট কাজগুলোই গড়ে তোলে এক অটুট ভ্রাতৃত্বের বন্ধন।

দুইশো বছর ধরে নীরবে এই বার্তাই দিয়ে আসছে গোপালঘাটার কালা গাজী শাহ জামে মসজিদের প্রাঙ্গণ- সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।