প্রথমে কয়েক শ’ কণ্ঠে উচ্চারিত হলো শব্দটি। মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ল শাহ্ মনজিল সীরত ময়দানের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। তারপর হাজারে, শেষে লাখো কণ্ঠে গমগম করে উঠল চুনতির আকাশ-বাতাস- ‘আমীন… আমীন…’।
দু’হাত তুলে প্রার্থনা করছেন লাখো মানুষ। কারো চোখে অশ্রু, কেউ নিঃশব্দে কাঁদছেন। দরুদ-সালাম আর সম্মিলিত দোয়ার সেই গগনবিদারী ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো চুনতি।
আবেগঘন এ মোনাজাতের মধ্য দিয়েই শেষ হলো চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতির ১৯ দিনব্যাপী ৫৬তম আন্তর্জাতিক মাহফিলে সীরাতুন্নবী (সা.)।
জনসমুদ্রে শেষ দিনের সমাপনী
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) চুনতির শাহ্ মনজিল সীরত ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় মাহফিলের সমাপনী আয়োজন। মাহফিলের শেষ দিনেও বক্তাদের আলোচনা শুনতে ও সমাপনী মোনাজাতে শরিক হতে সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের স্রোত নামে চুনতির দিকে।
বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ১৩ একরের সীরত ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। মূল প্যান্ডেল ছাপিয়ে মানুষের অবস্থান ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের সড়ক, মাঠ ও খোলা জায়গায়। যতদূর চোখ যায়, শুধু মাথা আর মাথা।
সমাপনী দিনে মাহফিল মোতাওয়াল্লী কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব মাওলানা হাফিজুল ইসলাম আবুল কালাম আজাদ সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে সাহারবিল আনোয়ারুল উলুম কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মাওলানা রুহুল কুদ্দুস আনোয়ারী, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. মাওলানা আবু বকর রফিক আহমদ, চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা মাহমুদুল হকসহ আলেমরা উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষ মেহমান হিসেবে ছিলেন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা ফারুক হোসাইন।
শান্তি-ঐক্য গড়তে মহানবীর আদর্শের আহ্বান
সমাপনী বক্তব্যে বক্তারা পবিত্র সীরাতুন্নবী (সা.)-এর জীবনাদর্শকে অনুসরণের ওপর জোর দেন। তারা বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ শুধু ব্যক্তিজীবনের জন্য নয়, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও অনুসরণীয়।
তাঁদের মতে, যুগে যুগে মানুষ বিভাজনের শিকার হয়েছে। কিন্তু যদি মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ ধারণ করা হয়, তবে সমাজ থেকে বিভাজন, হিংসা, অশান্তি ও নৈতিক অবক্ষয় দূর করা সম্ভব।
বক্তারা আরও বলেন, ইসলাম কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণে মানবিকতা, ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারলে একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
১৯ দিনব্যাপী বিশাল আয়োজনের সফল সমাপ্তি
মাহফিল মোতাওয়াল্লী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শাহজাদা মাওলানা আব্দুল মালেক মুহাম্মদ ইবনে দিনার নাজাত সমাপনী বক্তব্যে ১৯ দিনের বিশাল এই আয়োজনের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও সফল সমাপ্তির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
তিনি মাহফিল বাস্তবায়নে সহযোগিতাকারী আলেম-ওলামা, স্বেচ্ছাসেবক, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান।
“সীরাতুন্নবী (সা.)-এর শিক্ষা মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে এই আয়োজনকে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে,” বলেন তিনি।
১৯ দিন ধরে চুনতির সীরত ময়দান মুখরিত ছিল আলেমদের বয়ানে। ‘ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের প্রামাণ্যতা’, ‘কামিল মুরশিদের পরিচয় ও গুণাবলি’, ‘আল-কোরআন ও বিজ্ঞান’, ইবাদত ও নামাজের গুরুত্ব-দেশের বিশিষ্ট আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদরা এসব বিষয়ে আলোচনা করেন।
সমাপনী দিনেও গুরুত্বপূর্ণ বয়ান অব্যাহত ছিল। বান্দরবান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব আলহাজ্ব মাওলানা আলাউদ্দিন ইমামী ‘হযরত মু’আয (রা.)-কে প্রদত্ত রাসূল (সা.)-এর ১০টি অসিয়ত’ সম্পর্কে দরসে হাদিস উপস্থাপন করেন।
সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা আলহাজ্ব ড. মাওলানা এ.এফ.এম. খালেদ হোসাইন ‘বিদায় হজে রাসূল (সা.)-এর প্রদত্ত ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য’ নিয়ে আলোচনা করেন। আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাওলানা বি.এম. মুফিজুর রহমান আজহারী ‘ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা’ সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রফেসর ড. মাওলানা আ.ক.ম. আবদুল কাদের ‘শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)’ নিয়ে আলোচনা করেন। ঢাকার মুফতি মাওলানা আলী হাসান ওসামা ‘ইসলামের দৃষ্টিতে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা এবং অনৈক্যের কারণ ও পরিণতি’ তুলে ধরেন।
মাহফিল শেষ, শিক্ষা শেষ নয়
হযরত মাওলানা হাফেজ আহমদ প্রকাশ শাহ সাহেব কেবলা চুনতি (রহ.)-এর হাত ধরেই ১৯৬৯ সালে শুরু হয়েছিল চুনতির আন্তর্জাতিক সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল। সেই থেকে প্রতিবছর ১১ রবিউল আউয়াল শুরু হয়ে ২৯ রবিউল আউয়ালে সমাপ্ত হয় এই আয়োজন। টানা ১৯ দিন চলে দেশের খ্যাতনামা আলেম-ওলামাদের বয়ান।
এবার অনুষ্ঠিত হলো এর ৫৬তম আসর। দীর্ঘ ১৯ দিনের এই পবিত্র আয়োজনের পর্দা নামার সময় এসেছে।
সবশেষে যখন সমাপনী মোনাজাত শুরু হলো, ১৩ একরের সীরত ময়দান থেকে শুরু করে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা পর্যন্ত কেঁপে উঠল লাখো মুসল্লির সম্মিলিত কণ্ঠে। ‘আমীন, আমীন’-এর সেই পবিত্র ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো চুনতি।
মোনাজাত শেষ হলে একে একে মানুষ ফিরতে থাকেন নিজের ঘরে। কিন্তু বক্তাদের আহ্বানটুকু তাঁদের সঙ্গেই যাচ্ছে—
মাহফিল শেষ হয়েছে, তবে সীরাতের শিক্ষা যেন মানুষের জীবন থেকে শেষ না হয়।

