
হোসনে আরা বেগম ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন ড্রেসিং করাতে। পথে পথে কষ্ট করে লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টারে পৌঁছে দেখলেন- দরজায় তালা। ভেতরে কেউ নেই। চিকিৎসক নেই, নার্স নেই।
হতাশ মুখে ফিরে যেতে যেতে বললেন, “ছেলের ড্রেসিং করাতে এসেছিলাম। চিকিৎসক না থাকায় সেবা পাইনি। এখানে চিকিৎসা বন্ধ থাকায় আমরা খুব সমস্যায় পড়েছি।”
হোসনে আরার এই কষ্টের গল্প এখন লোহাগাড়ার অনেক মানুষের গল্প। কারণ গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে গেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা এই ট্রমা সেন্টারের চিকিৎসাসেবা।
তিন কোটির ভবন, এক দশকের অপেক্ষা
গল্পটা শুরু হয়েছিল আরও আগে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক- দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক। এই মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ২০ শয্যার ট্রমা সেন্টারটি। ২৯ আগস্ট উদ্বোধনও হয়।
কিন্তু উদ্বোধনের পরেই শুরু হয় অপেক্ষা। প্রয়োজনীয় জনবল নেই, সুযোগ-সুবিধা নেই। তাই চিকিৎসাসেবা আর চালু করা যাচ্ছিল না। ভবন দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু ভেতরে কার্যক্রম নেই।
প্রায় এক দশক পর স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর উদ্যোগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের (সিআইএমসি) যৌথ ব্যবস্থাপনায় অবশেষে চালু হলো ট্রমা সেন্টারের কার্যক্রম। ছয়জন চিকিৎসক, ১৫ জন নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে শুরু হলো সেবা। ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থাও রাখা হলো।
স্থানীয়রা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটলে এখন আর চট্টগ্রাম শহর পর্যন্ত ছুটতে হবে না।
এক বছরে ১২ হাজার রোগী
চালু হওয়ার পর মাত্র এক বছরে সেন্টারটি হয়ে উঠল এলাকার মানুষের ভরসার জায়গা। সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের পাশাপাশি সাধারণ রোগীরাও চিকিৎসা নিতে আসতে লাগলেন।
মাত্র এক বছরে প্রায় ১২ হাজার রোগী সেবা পেয়েছেন এখানে। প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী আসতেন।
ট্রমা সেন্টারে কর্মরত হাবীবুর রহমান শহীদ বলেন, “চালুর পর থেকে প্রায় ১২ হাজার রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে।” কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা আর রইল না।
চুক্তি শেষ, সেবা বন্ধ
চলতি বছরের ৩১ জুলাই সরকারের সঙ্গে সিআইএমসির চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। নতুন চুক্তি আর হলো না। ফলে ১ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে গেল চিকিৎসাসেবা।
সিআইএমসির অধ্যক্ষ ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন জানান, ট্রমা সেন্টারটি চালু করতে প্রায় এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল। সরকার দিয়েছিল ৭৯ লাখ টাকা। বাকি অর্থ পরবর্তী অর্থবছরের বরাদ্দ থেকে সমন্বয় করার কথা ছিল। কিন্তু নতুন চুক্তি না হওয়ায় সব থমকে গেছে।
এর আগে আগস্ট মাসে পরিস্থিতি সামলাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করেছেন। হাবীবুর রহমান শহীদ জানান, সংসদ সদস্যের আশ্বাসে তারা এটি করেছিলেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বেতন, চিকিৎসক ও ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় শেষ পর্যন্ত সেবা বন্ধ করতেই হলো।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ট্রমা সেন্টার পরিদর্শন করে যেকোনো মূল্যে এটি চালু রাখার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি। কিন্তু সেই আশ্বাস কাজে আসেনি।
দুর্ঘটনায় আহত মানুষের কোথায় যাওয়ার জায়গা
লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল ইফরান জানান, ট্রমা সেন্টারটি পুনরায় চালুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। তিনি আশা করছেন, শিগগিরই এ বিষয়ে অগ্রগতি হবে।
কিন্তু ‘শিগগিরই’র অপেক্ষায় মহাসড়কে দুর্ঘটনা থেমে থাকে না।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। দুর্ঘটনা ঘটলে আহত মানুষের জন্য প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে সময়ই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
ট্রমা সেন্টার বন্ধ থাকায় এখন গুরুতর আহতদের আবার ছুটতে হচ্ছে চট্টগ্রাম শহরের দিকে। সেই বাড়তি পথ, বাড়তি সময়- কখনো কখনো হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে
তিন কোটি টাকায় ভবন বানানো হলো। এক দশক অপেক্ষা করা হলো। অবশেষে চালু হওয়ার পর মাত্র এক বছরে ১২ হাজার মানুষ সেবা পেলেন। তারপর একটি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় সব বন্ধ।
প্রশাসনিক জটিলতা বা চুক্তিগত সমস্যা — যে কারণেই হোক, এই বন্ধের মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। হোসনে আরা বেগমের মতো যারা ড্রেসিং করাতে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। আর মহাসড়কে যারা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন, তারা জানেনও না যে কাছের ট্রমা সেন্টারটিতে এখন তালা।
স্থানীয়দের দাবি একটাই- দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল, অর্থ ও ওষুধের ব্যবস্থা করে ট্রমা সেন্টারটি আবার চালু করা হোক।
কারণ মহাসড়কে দুর্ঘটনা কখন ঘটবে, কেউ জানে না। কিন্তু দুর্ঘটনার পর একজন আহত মানুষের জন্য চিকিৎসার দরজা খোলা থাকবে কি না- সেটা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরই দায়িত্ব।
