হেরোইন সেবীদের নিয়ে বিপাকে পুলিশ!

heroin addictচট্টগ্রাম: সর্বনাশা মাদক হেরোইন। এ মাদক ব্যাথানাশক হিসেবে কাজ করে। হেরোইনে আসক্ত কেউ হঠাৎ করে তা সেবন বন্ধ করে দিলে মাথায় শুরু হয় প্রবল যন্ত্রণা। এমনকি অসহনীয় যন্ত্রণা অনুভূত হয় দেহের হাড়ের জয়েন্টগুলোতেও। এমনকি এ ধরনের মাদকাসক্তদের গ্রেফতারে পুলিশ উদ্যোগী হলে তারা বিরূপ আচরণ শুরু করে দেন। ঘটনাস্থল ও থানা হাজতে ব্লেড দিয়ে রক্ত ঝরানো, চিৎকার-চেঁচামেচি ও যত্রতত্র পায়খানা-প্রস্নাব ইত্যাদি করে বেসামাল হয়ে পড়ে আসক্তরা। ফলে হেরোইন আসক্তদের আইনের আওতায় আনতে গিয়ে বিপাকে পড়ছে পুলিশ সদস্যরা!

চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানা পুলিশের সেকেন্ড অফিসার এসআই সমর বড়–য়া বলেন, হেরোইনসেবী কেউ যদি হঠাৎ করে হেরোইন সেবন বন্ধ করে দেয় কিংবা সেবনের মাত্রা কমিয়ে দেয়, তাহলে মাথায় এক ধরনের প্রবল যন্ত্রণা অনুভুত হয়। কেউ কেউ শারীরিক অসহনীয় যন্ত্রণার অভিনয়ও করেন। এর ফলে হেরোইনে আসক্তদের গ্রেফতার করে থানা হাজতে এনে রাখতে কষ্ট হয়ে যায়।

তিনি বলেন, হেরোইন সেবীরা সবসময় নিজেদের হাতে ব্লেড রাখে। ব্লেড দিয়ে হাত ও শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে রক্তপাদ ঘটায়। হেরোইন না পেলে চিল্লাচিল্লি শুরু করে দেয়। তাই কোন সময় হেরোইন সেবী কেউ ধরা পড়লে, তাদেরকে দ্রুত আদালতে হাজির করি। আদালতে খারাপ প্রতিক্রিয়াও দেখায় অনেক হেরোইন সেবী। তখন সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক জামিন দিয়ে দেন অথবা দ্রুত শুনানি করে কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রামে মাদকসেবীদের প্রায় ১০ শতাংশ হেরোইনে আসক্ত। মাদকাসক্তরা বিভিন্ন উপায়ে হেরোইন সেবন করে থাকে। এর মধ্যে তিনটি উপায় বেশি প্রচলিত। ১. ইঞ্জেকশন, ২. ধূমপান এবং ৩. নাক দিয়ে গ্রহণ। যারা প্রথম উপায়টি গ্রহণ করে, তারা হেরোইন গ্রহণের মাত্র ৭-৮ সেকেন্ডের মধ্যে ফল পেয়ে যায়। পরের উভয় উপায়ে হেরোইন গ্রহণ করলে তার ফল পাওয়া যায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর। হেরোইন সেবনকারী এক ধরনের উচ্চমাত্রার আবেশ অনুভব করে, ত্বকের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, মুখ শুকিয়ে যায় এবং হাত-পা ভারি লাগা শুরু হয়। পাশাপাশি তার বমি ভাব, শরীরে দুর্বল লাগা এবং চুলকানি অনুভব হতে পারে। হেরোইন গ্রহণের কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যবহারকারী এ আবেশে থাকে এবং হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরগতির হয়। নেশা কেটে যাওয়ার কিছু সময় পরই সেবনকারী ফের হেরোইন নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, হেরোইনে আসক্তদের মধ্যে বেশীরভাগই ভাসমান লোকজন। ছিনতাই ও চুরি করে তারা হেরোইন কেনার টাকা জোগাড় করে। এ ধরনের মাদকাসক্তদের গ্রেফতারে পুলিশ উদ্যোগী হলে তারা বিরূপ আচরণ শুরু করে দেন। ঘটনাস্থল ও থানা হাজতে লাফালাফি, চিৎকার-চেঁচামেচি ও যত্রতত্র পায়খানা-প্র¯্রাব ইত্যাদি করে বেসামাল হয়ে পড়ে আসক্তরা। এতে বেকায়দায় পড়ে যান দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। বিভিন্ন সময় তাদেরকে ‘শান্ত’ করার জন্য মাদক সংগ্রহ করে তা সরবরাহও করতে হয়। এসব কারণে হেরোইন সেবীদের গ্রেফতারে আগ্রহ দেখায় না পুলিশ!

জানা গেছে, হেরোইন সেবন করে নগরীর স্টেশন রোড় এলাকায় ফুটপাতে পড়ে থাকতেন আনুমানিক ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। দীর্ঘদিন ধরে হেরোইন সেবন করার ফলে ওই ব্যক্তির হাত ও পা বাঁকা হয়ে পড়ে। বিভিন্ন সময়ে স্টেশন রোড় এলাকায় পুলিশ মাদকবিরোধী অভিযান চালালেও কোন সময় ওই ব্যক্তি গ্রেফতার হননি। একপর্যায়ে গত ১৮ এপ্রিল স্টেশন রোড় এলাকায় মারা যান তিনি। এরপর লাশটি উদ্ধার করে দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে হস্তান্তর করে কোতোয়ালী থানা পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর আহমদ বলেন, হেরোইন পেতে উগ্র হয়ে ওঠে হেরোইন আসক্তরা। এ মাদকে আসক্তরা সবসময় শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্লেড রাখে। এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, মুখের ভেতর ব্লেড রেখেছে। এরপর তাকে পুলিশ ধরতে গেলে সে মুখ নাড়িয়ে সেখানে ক্ষত সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে মুখ থেকে রক্ত বের করে দেয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বেকায়দায় পড়তে হয় পুলিশ সদস্যদের। এরপরও হেরোইন সেবীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করি।

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ গত ২০১৫ সালে কি পরিমাণ হেরোইন উদ্ধার করেছে- তার তথ্য নগর পুলিশের অপরাধ শাখায় খোঁজ করেও পাওয়া যায়নি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের চট্টগ্রাম মেট্টো অঞ্চলের উপ-পরিচালক আলী আসলাম বলেন, দেশের বন ও পাহাড়ি অঞ্চল এবং বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের মাছের ট্রলারগুলো বাংলাদেশে হেরোইন পাচারের নিরাপদ মাধ্যমে হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ভারত ও মিয়ানমারের রুট ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসায়ী ও মাফিয়ারা বাংলাদেশ রুট বেছে নিয়েছে।