‘কার্ড ছোঁয়ালেই রিচার্জ হবে মিটার, জ্বলবে চুলা’

আবু আজাদ : রূপকথার গল্পে পড়া ‘জীয়নকাঠি’ এবার সত্যি-সত্যিই ধরা দিতে যাচ্ছে নাগরিক জীবনে। কেজিডিসিএল’র ‘স্মার্ট কার্ড’ গ্যাসের প্রিপেইড মিটারে ছোঁয়ালেই রিচার্জ হয়ে যাবে মিটারটি, সঙ্গে সঙ্গে জীবন পাবে বাসার চুলা!

শুনতে রূপকথার গল্পের মতো মনে হলেও প্রতিনিয়ত সহজ হতে চলা জীবনকে আরো সহজ করে দিতে আজ থেকে চট্টগ্রামে প্রিপেইড মিটার চালু করেছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল)।

‘ন্যাচারাল গ্যাস ইফিসিয়েন্সি প্রজেক্ট’র প্রকল্প পরিচালক মো. সরওয়ার হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের জীবন প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে। সেই পরিবর্তনে আজ নতুন মাত্রা যোগ করেছে কেজিডিসিএল। আজ থেকে চট্টগ্রামে গ্যাসের প্রিপেইড মিটার চালু হলো। এতে গ্যাসের অপচয় রোধ ও গ্রাহকের খরচ কমবে।’

প্রিপেইড মিটারের সুবিধার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রাহকরা নির্দিষ্ট বুথ থেকে মোবাইল ফোনে টাকা রিচার্জের মতোই আমাদের সরবরাহকৃত কন্ট্যাক্টলেস ‘স্মার্ট কার্ডে’ প্রয়োজনীয় গ্যাসের টাকা রিচার্জ করতে পারবেন। সেই কার্ড মিটারে ছোঁয়ালেই রিচার্জ হয়ে যাবে মিটারটি, এরপর থেকে ব্যবহার করা যাবে চুলা।’

তিনি আরো বলেন, ‘এতে গ্যাস চুরি কমার পাশাপাশি গ্রাহকের ভোগান্তিও কমবে। প্রিপেইড মিটারিং ব্যবস্থায় গ্যাস-বিল বকেয়া রাখার কিংবা অবৈধভাবে গ্যাস-ব্যবহারের কোনো সুযোগ থাকবে না।’

প্রি-পেইড মিটার ব্যবহারে প্রাকৃতিক গ্যাসের অপচয় রোধের পাশাপাশি বকেয়া বিল ও বিল পরিশোধের জটিলতা থাকবে না। এর মাধ্যমে ব্যবহার অনুযায়ীই মূল্য প্রদান করতে হবে। নির্দিষ্ট মাত্রার ভূমিকম্প হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। মিটারে রিচার্জকৃত ক্রেডিট শেষ হয়ে গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হবে না। স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরুরি ব্যালেন্স দেওয়া হবে, যা পরবর্তী রিচার্জের সময় সমন্বয় করা হবে। ব্যবহার করা গ্যাস ও মিটার- সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য মিটারের এলসিডি ডিসপ্লেতে প্রদর্শিত হবে।’ বলেন প্রকল্প-পরিচালক মো. সরওয়ার হোসেন।

মোবাইল অ্যাপস থেকেই রিচার্জ করা যাবে ‘স্মার্টকার্ড’ :
‘স্মার্টকার্ড’ রিচার্জ করার জন্য ভোগান্তি পোহাতে হবে কিনা? একুশে পত্রিকা’র এমন প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প পরামর্শক হোসেন আহমদ জানান, ‘সরবরাহকৃত কন্ট্যাক্টলেস ‘স্মার্টকার্ড’ গ্রাহক চাইলে ঘরে বসেই রিচার্জ করতে পারবেন। এ জন্য প্রয়োজন শুধু একটি স্মার্ট ফোন। ফোনে কেজিসিএলে’র অ্যাপসটি ইনস্টল করে নিলেই হবে। গ্রাহক চাইলে তার নির্দিষ্ট একাউন্টটি এককালিন রিচার্জ করে রাখতে পারবেন। যে কোনো সময় ‘স্মার্টকার্ড’টি অ্যাপসের উপর ধরলেই কার্ড রিচার্জ হয়ে যাবে। পরে ‘স্মার্টকার্ড’ দিয়ে মিটার রিচার্জ করা যাবে।

উপ-প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. নাহিদ আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বর্তমানে ডাবল বার্নারের জন্য যে টাকা পরিশোধ করা হয়, প্রিপেইড মিটারে তার চেয়ে কম গ্যাস খরচ হয়। ডাবল বার্নারে প্রতিমাসে আমরা ৮০০ টাকা বিল দিয়ে থাকি। বর্তমান প্রতি ঘনমিটার ৯ টাকা ১১ পয়সা হিসেবে ৮০০ টাকায় পাওয়া যায় ৮৮ ঘনমিটার গ্যাস। কিন্তু জরিপে দেখা গেছে প্রতিটি মিটারে মাসে গড়ে ৫০ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। আর এই গ্যাসের দাম হলো ৪৫৫ টাকা। যার কারণে গ্রাহরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘স্বাভাবিক ব্যবহারের মধ্যেই যেখানে ৩৪৫ টাকা কমে যাচ্ছে সেখানে মিটার যুক্ত হওয়ার পর অপ্রয়োজনে গ্যাসের চুলা বন্ধ রাখা, কিংবা রান্না শেষ হওয়ার সাথে সাথে চুলা বন্ধ করে দেয়ার প্রবণতা গ্রাহকদের মধ্যে জন্ম নেবে এবং তখন আরো কম গ্যাস খরচ হবে। এতে বর্তমানের চেয়ে অর্ধেক টাকা বিল হবে।’

মিটার স্থাপনের পদ্ধতি জানাতে গিয়ে প্রকৌশলী মো. নাহিদ আলম বলেন, ‘প্রি-পেইড মিটারে ভবনে যতটি চুলা (ডাবল বার্নার) থাকবে রাইজার থেকে ততটি পাইপ বের হয়ে বিভিন্ন ফ্লোরে চলে যাবে। এতে একটি ভবনে ১২টি চুলা থাকলে রাইজার থেকে ১২টি জিআই পাইপের লাইন থাকবে। মিটার লাগানোর কাজটি কেজিডিসিএল করে দিচ্ছে।’

গ্রাহকরা রিচার্জ নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে প্রকৌশলী মো. সারওয়ার হোসেন বলেন, ‘রিচার্জ নিয়ে যাতে ভোগান্তিতে পড়তে না হয় সেজন্য আপাতত কেজিডিসিএল অফিসে দু’টি বুথ খোলা হয়েছে। পরে ধাপেধাপে বিভিন্ন ব্যাংকের ১৭টি শাখায় রিচার্জের ব্যবস্থা করা হবে।’

মিটারে ইমার্জেন্সি কোনো ব্যালেন্স থাকবে কিনা প্রশ্ন করা হলে প্রকৌশলী মো. সারওয়ার হোসেন বলেন, ‘গ্যাস শেষ হয়ে যাবার পর গ্রাহক ইমার্জেন্সি ৯ ঘনমিটার গ্যাস নিতে পারবে। যা দিয়ে প্রায় তিন দিন চলতে পারবে। এই সময়ের মধ্যে গ্রাহক তার কার্ড রিচার্জ করার সুযোগ পাবে। এছাড়া কার্ডে দাগ কমে গেলে গ্রাহক নিজেই বুঝবে গ্যাস কতটুকু রয়েছে। গ্রাহক চাইলে সর্বনিম্ন দুশ’ টাকা পর্যন্ত রিচার্জ করতে পারবেন।’
বুধবার (২৮ ফেব্রয়ারী) নগরীর নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির একটি বাড়িতে এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রকল্প-পরিচালক মো. সারওয়ার হোসেন জানান, ‘নগরীর নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি, ওআরনিজাম রোড, খুলশি, চকবাজার, কাজীর দেউড়ি, মেহেদিবাগ, হালিশহর হাউজিং এস্টেট, হিলভিউ আবাসিক এলাকা, মেহেদীবাগ, সুগন্ধা ও পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় মোট ২০ হাজার পাঁচশত গ্রাহক এ সেবা পাচ্ছেন। চট্টগ্রামের ১০ জোনের ৬০ হাজার গ্রাহককে এ প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা হবে।’

কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৫৪ কোটি ১১ লাখ টাকা দিচ্ছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। সরকার দিচ্ছে ৮১ কোটি ৪৫ লাখ এবং কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি দিচ্ছে ১০ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ২০১৮ সাল পর্যন্ত এ প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হবে।’

আরো : চট্টগ্রামে চালু হলো গ্যাসের প্রিপেইড মিটার

একুশে/এএ/এটি