যাদু দিয়ে পারলে মেয়রের চেয়ারে বসে যান !

চট্টগ্রাম : দর্শনার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাতের শিডিউল প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে ৪টা। বুধবার এই সময়টাতে প্রচণ্ড ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। ব্যস্ততার মাঝেই সাক্ষাৎ দেন জনা দশেক লোককে। কিন্তু হাতে স্লিপ আছে আরও অন্তত ১০ জনের। দুপুরেই নাম-ঠিকানা ও সাক্ষাতের কারণ লিখে স্লিপগুলো মেয়রের কাছে পাঠিয়েছেন সাক্ষাৎপ্রত্যার্শীরা। স্লিপ পাঠিয়ে দুপুর থেকে অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলোকে নিরাশ করতে চান না মেয়র। তাই মেয়র বললেন, বাকি সাক্ষাৎ-প্রত্যাশীদের সন্ধ্যা ৬টার দিকে সময় দেবেন। একটু কষ্ট করে যেন তারা বসেন।

বিকেল সাড়ে পাঁচটা। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের কর্মকর্তাসহ আলাদা আলাদাভাবে ৫ সাংবাদিক হাজির হন নগরভবনে মেয়রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। মেয়র এসময় প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে, বসেছেন দাপ্তরিক একটি মিটিংয়ে। মেয়র খবর পাঠালেন তার চেম্বারে বসতে। এর মধ্যে চেম্বারে এসে বসলেন প্রাক্তন কমিশনার রেখা আলম চৌধুরী। ১০-১৫ মিনিট পর কেউ একজন এসে বললেন মেয়র মহোদয় আপনাকে চিফ সাহেবের রুমে ডাকছেন। রেখা আলম গেলেন সেখানে। ঠিক তার ১৫ মিনিট পর মেয়র ফিরলেন তার চেম্বারে। তখন প্রায় সন্ধ্যা ৬টা। সাংবাদিকদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে মেয়র বললেন বসুন, চা খান। এই ফাঁকে নামাজটা সেরে নিই। এর মধ্যে মেয়রের রুমে জড়ো হন নানা শ্রেণীপেশার আরও ১৫-২০ জন।

নামাজ-শেষে চেয়ারে এসে বসলেন মেয়র। দুপুর থেকে স্লিপ পাঠিয়ে অপেক্ষায় থাকা লোকগুলোকে আগে বিদায় করে দিই। অফিস-স্টাফদের জানান মেয়র।

প্রথম সাক্ষাৎ-প্রত্যাশী মহিলাটি মেয়রের চেয়ারের কাছে দাঁড়ান। আবেদনটি হাতে নেন মেয়র। কী লেখা সেখানে অন্যদের বোঝার সুযোগ ছিল না। তাতে চোখ বুলিয়ে মেয়র কী বুঝলেন কী জানি। খুললেন ব্রিফকেস। এক হাজার টাকার বেশ কয়েকটি নোট বের করে রাখলেন টেবিলের সামনে। সেখান থেকে ৩-৪টি নোট গুঁজে দিলেন মহিলার হাতে।

দ্বিতীয় সাক্ষাৎপ্রত্যাশীও একজন মহিলা। দেখতে শুনতে পরিপাটি, ভদ্রঘরের মহিলা মনে হচ্ছে। মহিলা বাওয়া স্কুল ক্যাম্পাসে টিফিন কর্নার খুলতে চান। চান ব্যবসা করে দু-চার পয়সা কামাতে। স্কুলপরিচালনা কমিটির সভাপতি মেয়র। তাই তাঁর অনুমতি দরকার। মহিলার আবেদনটি পড়ে মেয়র ফোন করেন বাওয়া স্কুলের প্রিন্সিপালকে। এ নিয়ে প্রিন্সিপালের সঙ্গে মেয়রের কথা হয় প্রায় ৫ মিনিট। ফোনে কথা শেষ করে মেয়র জানালেন, মাত্র ১০ মিনিটের টিফিন-ব্র্যাক। এ সময়ের মধ্যে বাসা থেকে নিয়ে আসা টিফিনই কেবল খাওয়া সম্ভব। দোকান থেকে কিনে খেতে হলে ১০ মিনিটের মধ্যে টিফিন কিনে খেয়ে ক্লাশে ঢোকা কঠিন ব্যাপার। এতে করে বিশৃঙ্খলাও তৈরি হতে পারে। কাজেই এই অনুমতি আমি দিতে পারি না। মহিলা সুযোগটি পেতে আকুতি জানান। মেয়র তাকে বুঝিয়ে বললেন, এটা করতে গেলে স্কুলের শৃঙ্খলা, পড়ালেখার পরিবেশ ব্যাহত হবে। আমার পক্ষে করা সম্ভব এমন কাজ নিয়ে আসুন, আমি করে দেব। মহিলাটিকে কথায় কমফোর্ট দেয়ার চেষ্টা করেন।

মাঝবয়সী এক লোক এলেন তার উচ্চ মাধ্যমিক পাশ ছেলেকে নিয়ে। ছেলের একটা চাকরি চাই। মেয়র বললেন, করপোরেশনে সেবকের চাকরি (ঘরের ময়লা সংগ্রহ করা) ছাড়া এ মুহূর্তে আর কোনো চাকরি নেই। সিভিটা আমি রাখছি, দেখি অন্য কোথাও কিছু করা যায় কিনা। বলেই মেয়র লোকটাকে ৩ হাজার টাকা দিলেন। বললেন, কষ্ট করে এসেছেন এটা রাখুন, গাড়িভাড়া। লোকটা সংসারের অভাব-অনটনের কথা শোনালেন, বলেন ঘরে খাবার নেই, ঘরের চালায় টিন নেই।

কথাটি মেয়রকে ছুঁয়ে যায়। কয়ফিট, কয়টা টিন দরকার জানতে চেয়ে লোকটির প্রয়োজনীয় টিনের চাহিদা পূরণ করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দেন মেয়র।

এবার সাক্ষাৎ-প্রত্যাশী যাদুশিল্পী রাজীব বসাক। থিয়েটার ইনস্টিউটে যাদুসংক্রান্ত একটা অনুষ্ঠানে মেয়রকে প্রধান অতিথি করতে চান তিনি। মেয়রের সময় নেই, তাছাড়া মেয়র এই যাদুশিল্পীকে চিনেন না। যাদু নিয়ে মেয়রের ধারণাটাও তেমন ইতিবাচক নয় বলে মনে হলো।

এসময় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শুকলাল দাশ মেয়রকে রাজীব বসাকের পক্ষে সুপারিশ করলেন, সঙ্গে অন্য সাংবাদিকরাও। বললেন, যাদুশিল্পী হিসেবে তার সুনাম আছে। টিভিতে নিয়মিত প্রোগ্রাম করেন।

মেয়র মজা করে বললেন, এত সুনাম থাকলে তো আমি তাকে চেনার কথা। বাস্তবে আমি তার নাম এবং চেহারা এই প্রথম দেখলাম। কোন টিভিতে, কখন প্রোগ্রাম করেন জানতে চান মেয়র। রাজীব জানান, রাত দুইটা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত কয়েকটা বেসরকারি টেলিভিশনে তার প্রোগ্রাম দেখানো হয়। মেয়র বললেন, এ কেমন কথা! মানুষ যখন ঘুমান, তখন আপনার প্রোগ্রাম দেখায়। বুঝছি আপনি কেমন যাদুকর!

এরপর মেয়র আরও মজা করলেন। বলেন, এসমস্ত যাদুকরি অনুষ্ঠানে গেলে আমার ভোট কমবে। মানুষ বলবে, মেয়র এখন যাদুর পেছনে ছুটছেন।

এরপর সাংবাদিকরা রাজীব বসাককে ইশারা করলেন মেয়রকে তাৎক্ষণিক একটি যাদু দেখিয়ে দিতে। এরমধ্যে ফাইলে স্বাক্ষর করতে করতে মেয়র কাহিল। সাংবাদিকরা মেয়রকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ওনি আপনাকে এখনই একটি যাদু দেখাতে চান, এক মিনিট সময় দেন। সঙ্গে সঙ্গে সুযোগটা লুফে নিলেন রাজীব বসাক। প্যান্ট থেকে একটা কুড়ি টাকা এবং আরেকটি দুই টাকার নোট বের করে মেয়রের সামনে ধরলেন। নোট দুটি দেখিয়ে নিশ্চিত করলেন তার দুই হাতে এই দুটি নোট ছাড়া আর কিছুই নেই। মেয়রের হাতে কুড়ি টাকার নোটটি গুঁজে দিয়ে বললেন মুঠোবন্দী করতে। বাকি দুই টাকার নোট মুঠোবন্দী করলেন যাদুকর নিজেই।

কয়েক সেকেন্ড পর যাদুকরের অনুরোধে মুঠো খুললেন মেয়র। মুহূর্তেই মেয়রের কুড়ি টাকা হয়ে গেলো দুই টাকা। আর যাদুকর রাজীব বসাকের কাছে থাকা দুই টাকা হয়ে গেলো কুড়ি টাকা। এ যাদুতে রীতিমতো বিস্মিত মেয়রসহ উপস্থিত সবাই। এ কী করে সম্ভব! এবার রাজীব বসাকের দিকে একটু মনোযোগ দিলেন মেয়র। বলেন, যাদু দিয়ে দুই টাকাকে ২০ টাকা করা গেলে আপনি তো দেশের সব টাকার মালিক হতে পারেন ইচ্ছা করলে। পারলে যাদু দিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসে যান। আমি চলে যাই।

মেয়রের পালস বুঝে গেছেন যাদুকর রাজীব বসাক। মেয়রের মনোযোগ কাড়তে হাজির করেন মজার এক তথ্য। বললেন, একবার একটি অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রীকে টাকার যাদুটি দেখাতে গিয়ে বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম।

: কেমন সেটা! জানতে চান মেয়র…

: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে নির্দেশ দেন অর্থমন্ত্রী। তিনমাস ধরে আমার সমস্ত লেনদেন বন্ধ। ঘরভাড়া দিতে না পারায় বাড়ির মালিক বাসা ছাড়ার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। শেষপর্যন্ত সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বললাম, স্যার, আমাকে বাঁচান। আর কখনো এমন যাদু দেখাব না। প্লিজ অ্যাকাউন্টটা খুলে দিন। বলেন রাজীব বসাক।

: তারপর (কৌতূহল মেয়রের)!

: অর্থমন্ত্রী বললেন, এক শর্তে অ্যাকাউন্ট খুলে দিতে পারি। যাদুটা যদি আমাকে শিখিয়ে দেন। অগত্যা যাদু শিখিয়েই অ্যাকাউন্টটা খুলে নিলাম, তারপর হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

যাদুকরের যাদুকরী উপস্থাপনায় হাসির ফোয়ারা বয়ে যায় মেয়রের কক্ষজুড়ে। দারুণ খুশি মেয়রও। মেয়র বললেন, আপনার কয় ছেলে মেয়ে।

: তিন মেয়ে।

: কী পড়ে?

: বড়টা ‘ল’ পড়ে প্রিমিয়ারে।

: বাহ!

: বাকি দুই মেয়ে পড়ে খাস্তগীরে।

আপনার মেয়েরা তো অনেক ব্রিলিয়ান্ট। বলেন মেয়র।

রাজীব বলেন, আমার একটা অপ্রাপ্তি রয়েই গেছে। জীবনে সবখানে কমবেশি প্রোগ্রাম করার সুযোগ পেয়েছি, কিন্তু এই সিটি করপোরেশনে কোনো প্রোগ্রাম করতে পারলাম না।

মেয়র বললেন, পহেলা বৈশাখে সিটি করপোরেশনের সমস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠান আছে। সেদিন সবাই একইরকম খাবার খাবে। আপনিও আমাদের সঙ্গে খাবেন, যাদু দেখাবেন। এখন থেকে আপনি সিটি করপোরেশনে ইন হয়ে গেলেন। আপনার নম্বর দিয়ে যান, সময়মতো আপনাকে নক করা হবে।

এসময় টিভিতে অনুষ্ঠান করে কত টাকা পান জানতে চান মেয়র। রাজীব বসাক বলেন, খুবই কম। সিটিভিতে প্রোগ্রাম করে দেড় হাজার টাকার চেক গ্রহণের জন্য ৩শ’ টাকা ঘুষ দিতে হয়। ফের একচোট হাসলেন সবাই। স্টেজে ৩৫ মিনিটের অনুষ্ঠান করে রাজীব বসাক ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পাওয়ার কথা জেনে নেন। এর মধ্যে মেয়রের কক্ষে প্রবেশ করেন ফিরিঙ্গিবাজারের ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব। রাজীব বসাককে দেখে উইশ করলেন। মেয়রকে উদ্দেশ্য করে বললেন ও খুব ভালো যাদুকর। তার প্রোগ্রামে একটু যান। মেয়র বলেন, হ্যাঁ যাবো, তবে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে আমাকে ছাড়তে হবে।

এভাবে যাদুকর ইস্যুতেই কেটে গেলো অনেক সময়। রাত তখন প্রায় ৮টা। অবশ্য এরিমধ্যে ফাইলে স্বাক্ষর, ফোনালাপ, কে বা কাদের অনুরোধরক্ষায় সেদিনের ঢাকামুখী ট্রেনের স্লিপিং বাথের তাৎক্ষণিক ৫টি টিকেট কেটে দেয়া, সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ সেরে নেয়া আপ্যায়ন করানো ইত্যাদি ফাঁকে ফাঁকে সেরে নেন মেয়র।

এবার রুমে ঢোকেন দুপুর থেকে অপেক্ষা করা চবি ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে পদ-প্রত্যাশী ৩০ থেকে ৩৫ জন ছাত্রলীগ নেতা। মেয়র কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, তোমাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে এক বা একাধিক মামলা। কেন্দ্রে তোমাদের নাম পাঠালে সেই মামলাগুলো ধরে পত্রিকায় নিউজ হবে। একটা কাজ করো-তোমরা প্রত্যেকে তোমাদের নামের পাশে কার কী মামলা, কতটা মামলা আছে লিখে দাও। মামলাসহ তোমাদের নাম পাঠাব। এরপর কেন্দ্র যা করার করবে। তখন আমার কোনো দায় থাকবে না।

মেয়র বলেন, শিবির কিংবা ছাত্রদলের সঙ্গে এসব মামলা হয়েছে তা নয়। সবগুলো তোমাদের অভ্যন্তরীণ মামলা। এখানে মামলাছাড়া কে আছ দেখি বলো তো। জানতে চান মেয়র। সমস্বরে বেশ কয়েকজন হাত নাড়েন, বলেন আমাদের কোনো মামলা নেই।

ঠিক আছে, তোমাদের সঙ্গে পরে কথা বলবো। আমি এখন সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাদা কথা বলবো বলেই চেয়ার থেকে উঠে যান মেয়র। স্টাফদের প্রধান নির্বাহীর কক্ষটি প্রস্তুত করতে বললেন। এরপর দুজন সাংবাদিকের সঙ্গে সেখানে রূদ্ধদ্বার বৈঠক করলেন প্রায় ৩০ মিনিট।

সেখানেই এশারের নামাজে বসে পড়েন মেয়র। সময় সাড়ে ৮টা। তখনো মেয়রের রুমে, ব্যালকনিতে, গেটের কাছে শ’ খানেক মানুষের অপেক্ষা।

এর মধ্যেই ৫ বছর আগের বকেয়া বিল আদায়ে মেয়রের সহযোগিতার জন্য আসা মাঝবয়সী এক ঠিকাদার বলে উঠলেন- মেয়র সাহেব পারেনও বটে। সারাক্ষণ কীভাবে এত লোড নেন, ধৈর্য ধরেন-রীতিমতো বিস্ময়কর!

এডি/এটি/একুশে