সরকারিভাবে বঙ্গবন্ধুর বিকৃতি, কাকে তুষ্ট করতে?

চট্টগ্রাম : ম্যুরাল স্থাপন কিংবা ছবি আঁকার নামে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিকৃতি চলছেই। এবার বিকৃতিটা হয়েছে সরকারিভাবে, লোহাগাড়া উপজেলা কমপ্লেক্সে বঙ্গবন্ধুর বিকৃত ম্যুরাল বসানোর মধ্যদিয়ে।

গত ১৯ এপ্রিল (শুক্রবার) চলতিপথে প্রতিবেদকের চোখ আটকে যায় বঙ্গবন্ধুর বিকৃত ম্যুরালটিতে। ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট লোহাগাড়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ম্যুরালটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. মেজবাহ উদ্দিন।

ম্যুরালটির পাশে স্থাপিত নামফলকে উদ্বোধক হিসেবে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিনের নামের পাশাপাশি ম্যুরালটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে লোহাগাড়ার তৎকালীন ইউএনও মোহাম্মদ ফিজনুর রহমানের নাম লেখা আছে।

ভাস্কর ডি কে মামুনের ডিজাইনে লোহাগাড়া উপজেলা কমপ্লেক্সের সম্মুখভাগে স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালটি দেখে যে কারো চোখ আটকে যাবে। চেনাই যাচ্ছে না বঙ্গবন্ধুকে। বাস্তবের বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কোনো মিল নেই ম্যুরালটির।

সরকারি আয়োজনে জাতির জনকের এ বিকৃতিকে শুরু থেকেই মেনে নিতে পারেননি বঙ্গবন্ধুপ্রেমিরা। প্রিয় বঙ্গবন্ধুকে এমন বিকৃত, উদ্ভট চেহারায় দেখে অনেকেই কষ্ট পেয়েছেন। কষ্টের কথা শেয়ার করে এটা সরানোর অনুরোধ করতে গিয়ে উল্টো তৎকালীন ইউএনও’র কাছে তিরস্কৃত হয়েছেন কেউ কেউ-এমন তথ্য এসেছে একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে।

সাতকানিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের প্রাক্তন সভাপতি (১৯৯২) এইচ এমএ গনি সম্রাট এ প্রসঙ্গে একুশে পত্রিকাকে বলেন, বঙ্গবন্ধুর চিরায়ত অবয়ব ধ্বংস করে বঙ্গবন্ধুর নামে যেনতেন একটা ম্যুরাল স্থাপনের বিষয়ে তৎকালীন ইউএনও ফিজনুর রহমানের কাছে গিয়েও কোনো লাভ হয়নি। উল্টো তিনি গায়ের জোর দেখালেন, বললেন- এ ম্যুরালই থাকবে।

এরপর তিনি এ নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে ইউএনও ফিজনুর রহমান উল্টো ক্ষেপে যান, তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। বলেন গণি সম্রাট।

এ প্রসঙ্গে টেলিফোনে কথা হয় লোহাগাড়ার তৎকালীন ইউএনও, বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারি সচিব মোহাম্মদ ফিজনুর রহমানের সঙ্গে। তার দাবি কোনো বিকৃতি হয়নি। শিল্পী ডি কে মামুনের সুনিপুণ চিন্তায় এখানে তরুণ বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষ বয়স্ক বঙ্গবন্ধুকে দেখতে অভ্যস্ত, তরুণ বঙ্গবন্ধুকে নয়। সে কারণে হয়তো অস্বস্তিবোধ করছে কেউ কেউ।

তিনি বলেন, `শিল্পীর প্রথম নির্মাণের পর ম্যুরালটি বিকৃত মনে হয়েছিল। তাই দ্বিতীয়বার কাজ করে ম্যুরালটিকে এ পর্যায়ে আনা হয়েছে। তৎকালীন ডিসি মেজবাহ উদ্দিন স্যার দেখে ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার পরই মূলত এটির উদ্বোধন করা হয়।এরপরও এটা নিয়ে যখন সমালোচনা হচ্ছিল তখন বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলাম। তখনই আমি বদলি হয়ে যাই।’

ফিজনুর রহমান বদলি হওয়ার পর ১৭ এপ্রিল ২০১৭ তে লোহাগাড়া ইউএনও হিসেবে যোগ দেন মাহবুব আলম। সচেতন এলাকাবাসী বিকৃত ম্যুরালটি পরিবর্তনের জন্য শুরু থেকেই তার কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন।কিন্তু তিনি তাতে কর্ণপাত করছেন না বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। তারা বলছেন, সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে জামায়াতের ঘাঁটি ও মিনি পাকিস্তান হিসেবে পরিচিত লোহাগাড়া-সাতকানিয়া এলাকা। আপাতদৃষ্টিতে এখানে ঘাপটি মেরে থাকা স্থানীয় জামায়াতিদের খুশি করার জন্যই মূলত বঙ্গবন্ধুর বিকৃতিটাকে জিইয়ে রাখা হয়েছে।

একই কথা বলেছেন সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদ প্রফেসর ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী। বৃহস্পতিবার দুপুরে টেলিফোনে জানতে চাইলে একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ভাই, আপনাকে কী আর বলবো। জাতির জনকের এই বিকৃতির বিষয়টি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিং ও মাসিক সমন্বয়সভায় একাধিকবার তুলেছি।কী কারণে এই বিকৃতি এখনো ধরে রাখা হয়েছে তা বোধগম্য হচ্ছে না। তবে জামায়াতিরাই এতে বেশি খুশি হচ্ছে। দিনের পর দিন এই বিকৃতি মেনে নেয়া যায় না। বিষয়টি এবার সিরিয়াসলি দেখছি।যোগ করেন এমপি নদভী!

লোহাগাড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলমও বঙ্গবন্ধুর বিকৃতির বিষয়টা স্বীকার করেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ম্যুরালটিতে একজেক্ট বঙ্গবন্ধু আসেনি। এটি আমি আসার আগে হয়েছিল। যারা করেছে তাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছিলাম, তারা বলেছে এটা ধরতে গেলে পুরোটা নষ্ট হয়ে যাবে।আমি বললাম, এটাতে পরিপূর্ণ অবয়ব আসেনি, দেখতেও ভালো লাগছে না, বিকল্প কী করা যায়!তারা বললেন, নতুন আরেকটা করা লাগবে। তখন আমি বললাম আপনি টাকা-পয়সা নিলেন, এতকিছু করলেন। তারা বললেন, করতে গেলে একটু এদিক-সেদিক হয়- এসব বলছে আর কী। আমি ঠিক করেছি এই ফর্মে হয়তো এটাকে আর খুব বেশিদিন রাখবো না।বলেন ইউএনও মাহবুব আলম।

একুশে/এটি