মাইকবিহীন মসজিদে দুই ঘণ্টা পঁচিশ মিনিট…

surveillanceচট্টগ্রাম : শুক্রবার দুপুর ১২টা ২০ মিনিট। চট্টগ্রাম নগরীর রাহাত্তারপুল মোড়। পুলিশ বিট বলতেই রিকশাচালক বললেন, উঠুন! মিনিট পাঁচেক পর গিয়ে থামলাম পুলিশ বিটে। বাকলিয়া থানার আওতাধীন পুলিশের এই বিটের পাশ দিয়ে পশ্চিমদিকে চলে গেছে একটি সড়ক। এই এলাকাটি গোলবাগ আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত। হেঁটে দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে পৌছে গেলাম একটি মসজিদের কাছে… মাইক ছাড়া মসজিদ.. কেউ কেউ দরবারী মসজিদ নামেও চিনেন!

তখন ১২টা বেজে ৩০ মিনিট। লোহা দিয়ে তৈরী গেইট। একপাশে ছোট দরজা দিয়ে একের পর এক মানুষ ঢুকছেন। বেশিরভাগই তরুণ শ্রেণীর। সঙ্গী ছিলেন বাইশ বছরের এক মেধাবী তরুণ মহিউদ্দিন মারুফ; পটিয়ার বড়লিয়ায় গ্রামের বাড়ি, বাবা-মার সঙ্গে থাকেন চাকতাইয়ের তুলাতলিতে। অস্বাভাবিক আচরণের এই তরুণই মসজিদের সীমানায় আসার আগেই সতর্ক করে দিয়েছেন যে, মোবাইল থাকলে বন্ধ করে ফেলতে হবে। মসজিদে প্রবেশের পর মোবাইলের শব্দ হলে, যিনি নিয়ে এসেছেন, তার উপর দায় বর্তাবে! শুধু শুধু ‘সাহায্যকারী’ তরুণ মারুফকে যাতে কেউ দোষারোপ করতে না পারে, সেজন্য আগেই মোবাইল বন্ধ করে রাখলাম।

এরই মধ্যে মসজিদটিতে প্রবেশের পর এপাশ ওপাশ একটু চোখ বুলিয়ে নিলাম। তিনতলা ‘ভবন’। নিচ তলা ব্যবহার হয় মসজিদে সার্বক্ষণিক থাকা ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষদের বিশ্রাম ও ‘দাওয়াতি’ কাজে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা ব্যবহার হয় মসজিদ হিসেবে। মসজিদ ভবনের পশ্চিমে রয়েছে একটি পুকুর; এটি অযুর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। মসজিদের উত্তর পাশে রয়েছে বড় আকারের ঘর; যেখানে প্রতি বেলায় শতাধিক মানুষের খাওয়া-দাওয়া চলে।

১৯৮০ সালে যখন এ দেশের মসজিদগুলোতে মাইকের ব্যবহার শুরু হয়; তখন থেকে এক ব্যতিক্রমী নিয়ম চালু হয় এটিসহ দেশের কয়েকটি মসজিদে। সেটা হচ্ছে- নামাজ, কোরআন তেলাওয়াতসহ ধর্মীয় সব ধরনের কাজে মাইক ব্যবহার করা হয় না এসব মসজিদে। স্বাভাবিকভাবে মসজিদে নেই কোনো মাইক। তবে ডিজিটাল ঘড়ি, সারি সারি বৈদ্যুতিক ফ্যান, বাতি রয়েছে।

সময় ১২টা ৫০ মিনিট। মাথার উপর চলতে থাকা ফ্যানগুলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। নিচের সারির মুসল্লীরা দাঁড়িয়ে সামনের সারির দিকে, খতিব সাহেবের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টায় ছিল। নতুন মুসল্লী হলে মনে করবেন, এই বুঝি বিদ্যুৎ চলে গেল! না বিদ্যুৎ যায়নি। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ একটু পরই খতিব সাহেব বয়ান শুরু করবেন। ফ্যানের বাতাসের কারণে যাতে বক্তব্য বুঝতে অসুবিধা না হয়- সেজন্য এই ব্যবস্থা!

১২টা ৫২ মিনিটে বয়ান শুরু করেন মসজিদের খতিব। এই মসজিদে কেন মাইক রাখা যাচ্ছে না- তার অসংখ্য ‘যুক্তি’ তুলে ধরা হল খতিবের বয়ানেও। বললেন, শরীয়তের দৃষ্টিতে মুসল্লীগণের জন্য ইমামের কেরাত শুনা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত বা মুস্তাহাব কিছুই না। অর্থাৎ জামাতে অংশগ্রহণকারীরা ইমামের কেরাত শুনতে না পেলেও তাদের নামাজের কোনো ক্ষতি হবে না, এমনকি সওয়াবেরও তারতম্য হবে না। অতএব শরীয়তের দিক থেকে নামাজে মাইক ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অনাবশ্যক।

মাইক ছাড়া নামাজ পড়েন এমন মানুষের সংখ্যা কম হওয়া নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই খতিব। এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি ৪১ বছর ‘মাইকওয়ালা একটি মসজিদে’ নামাজ পড়িয়েছেন। বছরে একজনকেও যদি ‘দাওয়াত’ দেয়া যেত, তাহলে তিনি সেখানে ৪১জন নিয়ে একটি জামাত পড়তে পারতেন।

২৮ বছর ধরে ‘মাইকওয়ালা একটি মসজিদে’ ইমামতি করা আরেক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২৮ বছরে ২৮ জন হলেও কম কি? আজকে আমার সামনে ৫শ জন আছেন, আপনারা মাসে একজনকেও যদি দাওয়াত দেন, তাহলে মাসে হয় ৫শ, বছরে ৬ হাজার।

আল্লাহতায়ালা চাইলে যে কাউকেই ক্ষমা করে দিতে পারেন- এ প্রসঙ্গটি নিয়েই শুক্রবার বেশী আলোচনা করেন তিনি। নানা উদাহরণ ও জীবন-কাহিনী দিয়ে তিনি বিষয়টি শ্রোতাদের বুঝানোর চেষ্টা করেন। একেকটা উদাহরণ দেওয়ার পরপরই মুসল্লীদের মধ্যে কেউ কেউ উত্তেজিত হয়ে এক ধরনের শব্দ করে উঠেন! কিছুটা জিহাদি জিহাদি ভাব।

মাইক ছাড়া মসজিদে মুসল্লীরা জুমার নামাজ পড়েন দুপুর ১টার ৫০ মিনিটে। এভাবে দেরী করে নামাজ পড়া প্রসঙ্গে নামাজের আগে বক্তৃতায় খতিব বলেন, আগে আমি এই মসজিদে জুমার নামাজ পড়ার জন্য সকাল ৭টায় ঘর থেকে বের হতাম। মসজিদে পৌছতে ১০টা, ১১টা, ১২টা বেজে যেত। এখন আপনারা সবাই দেরী করে আসেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে, তাই দেরী করতে হচ্ছে। সবাই আগে-ভাগে চলে আসলে আমরা দ্রুত নামাজ পড়ে নিতে পারতাম।

জুমার মূল নামাজ (দুই রাকাত) পড়ার আগে এই প্রতিবেদককে উদ্দেশ্যে করে আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী এক যুবক বললেন, আপনি টি-শার্ট পড়ায় ইমামের সাথে একই তলায় সারির মাঝে নামাজ পড়তে পারবেন না। আপনার নামাজ তো হবেই না…আমাদের নামাজও হবে না। আপনাকে উপরের তলায় (৩য় তলা) গিয়ে সারির একপাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে হবে।

অগত্যা উপরের তলায় গিয়ে নামাজ শেষে আশপাশে দেখলাম, কেউই টিশার্ট পরেননি। এরপর মসজিদের নিচে নেমে দেখা গেল, ধর্মীয় বইয়ের ছোট একটা স্টল নিয়ে দাঁড়িয়েছেন দাঁড়ি-টুপি পাঞ্জাবীওয়ালা দুইজন। মাইকের ব্যবহার সম্পর্কিত বেশকিছু বই দেখা গেল তাতে।

এরইমধ্যে ২টা ১৫ মিনিটের দিকে একজন এসে নিয়ে গেলেন মসজিদ ভবনের নিচের তলায়; নতুন আগতদের সেখানে একত্রিত করা হয়। কার্পেটের উপর একে একে জড়ো হতে থাকেন অর্ধশতাধিক মানুষ; যাদেরকে মাইক ছাড়া ইবাদাত করার জন্য ‘দাওয়াত’ দেওয়া হবে। এরপর ২টা ২০ মিনিটের দিকে সেখানে আসেন একজন ‘মাওলানা’। তিনি মাইক ব্যবহার নিয়ে নানা যুক্তি তুলে ধরে বক্তব্য দেওয়া শুরু করলেন।

অবাক করা বিষয় হল- ওই মাওলানা যা বলছেন, সবই মুখস্ত করা বা শেখানো কথা! তিনি যেসব ‘যুক্তি’ তুলে ধরছেন, তা ‘ডিজিটাল ব্যানারে’ আগে থেকেই লেখা ছিল। ওই ‘মাওলানা’ এসব যুক্তি অনর্গল বলে যাচ্ছেন, সাথে সাথে তার হাতের ডান পাশে দাঁড়িয়ে দুইজন ‘ডিজিটাল ব্যানার’ খুলে তা দেখাচ্ছেন। অন্য একজন ‘ব্যানারের’ উপর লাঠি দিয়ে লাইনের পর লাইন নিচে নামছেন।

আলাদা দুটি ‘ব্যানারে’ থাকা তিনটি বক্তব্য সবার সামনে তুলে ধরে তা জামায়াত নেতা দেলওয়ার হোছাইন সাঈদী, হেফাজত আমীর আল্লামা আহমদ শফী ও মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের বলে দাবি করা হয়। এতে উল্লেখ করা কথাগুলো সংক্ষেপে বললে যা হয়- তা হচ্ছে, মাইক ব্যবহার করে ইবাদত সঠিক না।

২টা ৪৫ মিনিটের দিকে ওই ‘মাওলানা’র যুক্তি তুলে ধরা শেষ হলে, বক্তার আসনে আসেন অন্য এক ‘মাওলানা’। তিনি শুরুতেই বললেন, আল্লাহ আমাদেরকে দুই তিন ঘন্টা বসে ইসলামের কথা শুনার তাওফিক দান করুন। এরপর তিনিও নানা ‘যুক্তি’ দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করলেন যে, নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতে মাইক ব্যবহার করা ‘হারাম’।

বিকেল ৩টা। মসজিদ নিচ তলা থেকে বের হয়ে মোবাইল হাতে নিলাম। একজন দৌড়ে এসে বললেন, কি.. কল এসেছে? ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়লে তিনি বললেন, গেইটের বাইরে গিয়ে কথা বলুন। এখানে কথা বলা নিষেধ। এরপর বের হয়ে হাঁটা শুরু করলাম পুলিশ বিটের দিকে। বিটের পাশেই পেলাম একটি রিকশা। রিকশাচালক ওই এলাকায় বসবাস করছেন তিন বছরেরও বেশী সময় ধরে।‘মাইক ছাড়া মসজিদ’ সম্পর্কে জানতে চাইলাম তার কাছে। তিনি বললেন, বছরখানেক আগে তিনি ওই মসজিদে নামাজ পড়েছিলেন। মসজিদের আশপাশের শ’খানেক লোক সেখানে নামাজ পড়ে। বেশীরভাগই আশপাশে থাকা অন্য দুটি মসজিদে নামাজ পড়তে যান।

এদিকে মাইক ছাড়া মসজিদের দ্বিতীয় তলায় যেখানে ইমামের পেছনে নামাজ হয়, সে তলায় নামাজের সারি রয়েছে ১৪টি। আর তৃতীয় তলায় সারি রয়েছে ৯টি। মসজিদভর্তি মুসল্লী চোখে পড়েছে। প্রতি সারিতে কমপক্ষে ৫০জন মানুষ নামাজ পড়ে; সে হিসেবে এক হাজারের কিছু বেশী মানুষ এই মসজিদে নামাজ পড়েছেন।

ওই রিকশাওয়ালার ভাষায়, মাইক ছাড়া মসজিদে দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। স্থানীয় মানুষ কম। তাদের খাওয়া-রান্না একটু আলাদা। কেউ কেউ নিরামিষও খায়। তারা যা বুঝায়, আমি তা বুঝি না। তাই অনেকদিন ধরে সেদিকে যাই না।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় এক আওয়ামী লীগ নেতার মেধাবী ছেলে সাব্বিরুল হক কনিক। মূলত এই মসজিদে নামাজ পড়েই চারমাস ধরে নিখোঁজ তিনি। তার সাম্প্রতিক ফেসবুক তৎপরতা বলছে, বর্তমানে তিনি কোনো এক জঙ্গীদলে সম্পৃক্ত আছেন। এই মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে তিনি জগতের বাকি মুসলমানকে মুসলমান মনে করতেন না। অন্যদের অনৈসলামিক, অমুসলিম বলেও গালমন্দ করতেন। তার স্বজনসহ অনেকের দাবি, এই মসজিদে এভাবেই তরুণদের মগজধোলাইয়ের মাধ্যমে জঙ্গী কিংবা জিহাদে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

মূলত এসব জানার জন্যই মুসল্লি বেশে সেই মসজিদে যাওয়া। একে তো নতুন, তার ওপর পরনে টিশার্ট, তাই সন্দেহের চোখ, সবার অস্বাভাবিক দৃষ্টি যেন প্রতিবেদকের দিকে। মগজধোলাইটা যদি নিজেরই হয়ে যায়! তাই বাকি ২-৩ ঘণ্টার বয়ান না শুনে বেরিয়ে আসতে হলো। পুরোটা সময় যদি থাকা যেতো, সমীকরণটা হয়তো মিলে যেতো! বিস্মিত হওয়ার মতো ব্যাপার যে, এখনো এই মসজিদটি পুলিশের নজরদারিতে নেই। অথচ পাশেই পুলিশ ফাঁড়ি, দুই কিলোমিটারের ব্যবধানে সিএমপির বাকলিয়া থানা।