মো: আবদুল মান্নান : আজ ২৫ বৈশাখ। ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। রবির ১৫৭ তম জন্মদিন। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে তাঁর জন্ম। চট্টগ্রামে বড় কোনো আয়োজন লক্ষ করছি না। তবে নানা রবীন্দ্রনাথের মালা সাজিয়ে হয়তো কেউ কেউ বসেছেন। সবার খবর আমার জানার বাইরে। এটাই স্বাভাবিক।
সাত রঙের গণমাধ্যমে জন্মদিনের আমেজ-আয়োজনে, উৎসবে বা সাজ-সজ্জায় বেশ ভাব-গাম্ভীর্য বোঝা যাচ্ছে। তাঁর জন্মদিন বললে সারা দুনিয়ার বাংলা ভাষাভাষি মানুষের বা বাঙালির জন্মদিন মনে হয়। দিন যায়, বছর যায়, কাল নিরবধি। জন্মদিন যেন ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে দেশান্তরে, ভাষা থেকে ভাষান্তরে, জাতি থেকে জাতিতে। বছর ঘুরে বৈশাখ মাস এলেই বাঙালিদের মাঝে তাঁর জন্মদিনের তাগিদ ও কর্তব্যবোধ চমকে নাড়া দিয়ে উঠে। তাঁকে ভুলে থাকা যায় না। অবহেলা করা অন্যায়। বরণ করে না নেয়া অকৃতজ্ঞতার শামিল। বাঙালিত্ব নিয়ে অহংকার করতে চাইলে তিনি স্মরণীয় হবেন। যে সব কারণে তাঁকে অকৃপণভাবে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করতে হবে এর সামান্য অংশবিশেষ তুলে ধরা যাক।
প্রায় আটষট্টি বছর লিখেছেন তিনি। মানুষের জীবন ও জগতের সাথে সম্পৃক্ত এমন কোনো বিশেষ বিষয়বস্তু বা অনুষঙ্গ নেই, যা তাঁর লেখায় অনন্য ও অসাধারণভাবে উঠে আসেনি। তার এসব সৃষ্টি বিগত প্রায় একশ চল্লিশ বছর বাঙালি পাঠক ও শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধে আচ্ছন্ন করে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এটি বিশ্বসাহিত্যে বিরল এবং বিস্ময়কর। তাঁর বায়ান্নটি কাব্যগ্রন্থ, পঁচানব্বইটি ছোট গল্প, তেরটি উপন্যাস, অসংখ্য নাটক, উনিশশ’ গান, প্রায় আড়াই হাজার চিত্রশিল্প বা চিত্রকর্ম। তিনি চলচ্চিত্রকার, চলচ্চিত্র অভিনেতাও ছিলেন।
১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর ‘গীতাঞ্জলী’ কাব্যের জন্য বিশ্বসাহিত্যে প্রথম বাঙালি নোবেল জয়ী তিনি। Song offerings নামে ১৯১২ সালে লন্ডনে এটি প্রথম ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল মর্মান্তিক জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের দেয়া ‘স্যার’ উপাধি বর্জন করেন। পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথের চতুর্দশ সন্তানের মধ্যে অষ্টম পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে ৮৭ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন। দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর পূর্বে বিলেতেই মৃত্যু বরণ করেছিলেন। ১৮৮৩ সালে তাঁর বিয়ে। স্ত্রী মৃণালিনী দেবী।
লর্ড কার্জনের নেতৃত্বে বঙ্গবঙ্গের সিদ্ধান্ত হলে তিনি অসংখ্য স্বদেশী গান ও কবিতা রচনা করে এর বিরোধিতা করেন। প্রিয় বাংলাদেশকে তিনি অখণ্ডই দেখতে চেয়েছিলেন। আমাদের মহান জাতীয় সংগীত সে সময়েরই তাঁর এক মহৎ সৃষ্টি। ভারতেও তাঁর ‘জনগনমন অধিনায়ক’ গানটি গাওয়া হয় তাদের জাতীয় সংগীত হিসেবে। মাত্র তের বছর বয়সে তাঁর প্রথম কবিতা অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ প্রতি জন্মদিনেই একটি জন্মদিনের কবিতা রচনা করতেন। পঁচিশ বছর বয়স থেকে পঁচিশে বৈশাখ উপলক্ষে একটি নতুন কবিতা তিনি ভক্তদের উপহার দিয়েছেন।
কবির ৭০তম জন্ম জয়ন্তী উৎসব হয়েছিল কলকাতায়। কমিটিতে যাঁরা ছিলেন; স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র চট্যোপাধ্যায়, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়, সি.ভি রমণ, বিড়ালা জি ডি প্রমুখ। কবির শেষ জন্মদিন ১৯৪১ সালের ১ বৈশাখে হয়েছিল। শেষ জন্মদিনে কবিকে শুভেচ্ছা পাঠিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। তিনি কবির শতবর্ষ জীবন কামনা করেছিলেন। ১৯৩৬ সালের ২৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে ডক্টরেট ডিগ্রী দান করে। শেষ কবিতা “তোমার সৃষ্টির পথ” ১৯৪১ সালের ৩০ জুলাই লেখা হয়। মৃত্যুর পূর্বে তিনি আর কিছু লেখেননি।
১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট আশি বছর তিন মাস বয়সে কলকাতার জোড়া সাঁকোর যে ঘরে তিনি জন্মেছিলেন, সে ঘরেই তাঁর মহাকাব্যিক জীবনের অবসান হয়। তাঁর মৃত্যুতে পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলেন। তিনি তখন কারাগারে। তাঁকে তিনি মহাত্মাগান্ধীর সাথে তুলনা করতেন। যদিও দু’জনের আদর্শ এবং পথ ছিল আলাদা। কবির ভাষায়-
“সেদিন পঁচিশে বৈশাখ
আমাকে আনল ডেকে
বন্ধুর পথ দিয়ে
তরঙ্গমন্দ্রিত জনসমুদ্রতীরে।”
বাঙালির জন্ম-জন্মান্তরের অহংকার বিশ্বকবির জন্মদিন শুভ হোক।
লেখক : বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম
