গভীর রাতের সহকারী প্রক্টর!


চট্টগ্রাম: মঙ্গলবার রাত সাড়ে নয়টা। ষোলশহর রেলস্টেশনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী শাটলট্রেন আটকে চালককে অপহরণ করে দূর্বৃত্তরা। স্টেশনে আটকা পড়ে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী। যারা সকলেই বিশ্ববিদ্যালয় বা আশপাশের এলাকায় থাকে। এক ঘন্টা পরও ট্রেন ছেড়ে না যাওয়ায় তারা জানতে পারে চালক অপহরণের ঘটনা। ঘড়ির কাটায় তখন রাত সাড়ে ১০টা।

স্টেশন মাস্টারের কক্ষে থাকা কর্মচারীদের উপর চড়াও হওয়ার উপক্রম উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের। পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জসহ পুলিশ সদস্যরা অসহায় উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের চিৎকার-চেচামেচিতে। কারণ তাদের হাতে নেই কোনো সমাধান। সময় যত যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের উত্তেজনা ততই বাড়ছে। আটকে যাওয়া শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যসহ প্রশাসনের লোকজনের প্রতিও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকে।

এদিকে চালক অপহরণ হওয়ায় রেলওয়ে লোকোমাস্টার এসোসিয়েশন ষোলশহর রেলস্টেশনের কর্মচারীদের জানিয়ে দিয়েছে- এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেন চালিয়ে নিয়ে যেতে রাজি না কোন চালক। এ ঘটনা জানাজানি হলে ষোলশহর জুড়ে তৈরী হয় চরম উত্তেজনা।

ঘড়ির কাটায় তখন রাত সাড়ে ১১টা। স্টেশনে শিক্ষার্থীদের জটলা ঠেলে মোটরসাইকেল এলো প্লাটফর্মের সামনে। এই বাহন থেকে নামলেন একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। নাম হেলাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় সহকারী প্রক্টর। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তার। তবে তার কর্মপরিধিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কোন সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব তার নয়।

মোটরসাইকেল থেকে নেমেই তিনি প্রবেশ করলে ষোলশহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জাকিরের কক্ষে। শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে বিষিয়ে ওঠা এই পুলিশ কর্মকর্তাকে নিজের পরিচয় জানাতেই তিনি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। কারণ টানা দুই ঘন্টা ধরে শিক্ষার্থীদের গালমন্দ শুনতে শুনতে বিরক্ত তিনি।

শিক্ষার্থীদের একটাই দাবি, ‘ট্রেন ছাড়তে হবে। এবং পুলিশকেই এ ট্রেন ছাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’ কিন্তু সে ক্ষমতা যে নেই ওই কর্মকর্তার তা বুঝতে নারাজ শিক্ষার্থীরা! আর তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে পেয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের এবার বলে উঠলেন, ‘আপনারা শান্ত হোন। স্যার এসেছেন। আপনাদের যাতায়াতের বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।’

এক পর্যায়ে সহকারী প্রক্টর হেলাল শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বললেন। জানতে চাইলেন আনুমানিক তারা ক’জন শিক্ষার্থী স্টেশনে রয়েছেন যাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হবে। শিক্ষার্থীরা জানালেন দেড় থেকে দুই’শ। শিক্ষার্থীদের শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি মোবাইল ফোনে কথা বললেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরীর সঙ্গে। জানালেন পরিস্থিতি। নির্দেশনা পেয়ে এরপর নিজেই কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সাথে নিয়ে ষোলশহর স্টেশন থেকে মূল সড়কে দাড়িয়ে গেলেন বাস ঠিক করতে। কিন্তু না এতো রাতে কোন বাস পাওয়া গেল না। কয়েক শিক্ষার্থী মিলে চলে গেলেন মুরাদপুর মোড়ে। সেখানে একটি বাসের চালককে শিক্ষার্থীদের আটকে পড়ার বিষয়টি বুঝিয়ে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দিতে অনুরোধ জানালেন।

এদিকে সোমবার পেরিয়ে ঘড়ির কাটা মঙ্গলবারের ঘরে। মাত্র একটি বাস জোগাড় হল। তখনও শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী নিরুপায় দাড়িয়ে রইল গাড়ির আশায়। কারণ সড়ক জুড়ে অসংখ্য গাড়ি, তাতে দেখা মিলছে বাস, ট্রাক। নগর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গভীর রাতে যাওয়ার কোন গাড়ি নেই। এক পর্যায়ে ওই শিক্ষক চলে গেলেন বহদ্দারহাট মোড়ে। সেখান থেকে হতাশ হয়ে ফিরতে হল তাকে। রাত সাড়ে ১২টার দিকে মুরাদপুর মোড়ে দাঁড়িয়ে একেকটি বাস চালককে অনুরোধ করেই যাচ্ছিলেন তিনি। প্রয়োজনের দ্বিগুণ ভাড়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করে রাজি হল তিনটি বাস। তখর ঘড়ির কাটা রাত দেড়টার ঘরে।

এরপর বাসগুলোকে নিয়ে যাওয়া হল ষোলশহর রেলস্টেশনে। তারপর প্লাটফর্মে ক্লান্ত হয়ে বসে থাকা শাটলের যাত্রীদের উঠানো হলে বাসগুলোতে। রাত ১০ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে কিংবা কটেজে পৌঁছার কথা যে শিক্ষার্থীদের তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছতে হল রাত আড়াইটায়! তাতে কি! ট্রেন আটকে বিড়ম্বনায় পড়ার ক্ষোভ পরিণত হল আনন্দে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের এমন দায়িত্বশীল আচরণ তাদের প্রত্যাশায় ছিল না! আতংকের চেহারাগুলোতে ভেসে উঠলো স্বস্তির ছাপ।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাসান বলেন, চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে আসার পরপরই যদি আমরা বুঝতে পারতাম ট্রেন যাবেনা। তাহলে আমরা দুই ঘন্টা অপেক্ষা করতাম না। বিকল্প ব্যবস্থায় ক্যাম্পাসে চলে আসতাম। রেলওয়ে পুলিশ আর স্টেশন মাস্টারের রুমে থাকা কর্মচারীরা বলছিল ট্রেন ছাড়বে যেকোন মুহুর্তে- আমরা অপেক্ষায় রইলাম। রাত সাড়ে ১১টার পর বুঝতে পেরেছি ট্রেন যাওয়ার আর সুযোগ নেই। তখন বিশ্ববিদ্যালয়গামী কোন বাস, সিএনজি অটোরিকশাও নেই। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় সহকারী প্রক্টর হেলাল স্যার এসে পরিবহণের ব্যবস্থা করায় ক্যাম্পাসে দেরিতে হলেও আমরা নিরপাদে ফিরেছি। গভীর রাতে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর এমন দায়িত্বশীল আচরণ এখন খুব একটা দেখা যায় না।

ষোলশহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জাকির বলেন, শিক্ষার্থীরা ট্রেন যাবেনা- এমন খবর শুনে এতোটাই উত্তেজিত ছিল যেকোন মুহুর্তেই বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়তে পারতো। এমন আশংকায় পড়ে আমরা পাঁচলাইশ থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশও খবর দিয়ে আনিয়েছি। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কিছুতেই বুঝিয়ে শান্ত করা যাচ্ছিল না। এমন মুহুর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরের উপস্থিতি আগুনে পানি ঢালার মতই কাজ দিল।

তিনি বলেন, বাসগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে ষোলশহর স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার মুহুর্তে ঘড়ির কাটা ছিল রাত প্রায় পৌনে দুইটা। বাস ছেড়ে যাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনি আমাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতেও ভুলেননি। শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি এ খবর প্রক্টর মহোদয়কে অবহিত করেই স্টেশন থেকে ফিরে যান বাসায়। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পরিবার-পরিজনের চিন্তা মাথায় না রেখে গভীর রাতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ছুটে আসবে- এখনকার স্বার্থবাদী সময়ে সত্যি তা বিরল দৃষ্টান্ত।

এ বিষয়ে সহকারী প্রক্টর হেলাল উদ্দিন আহমেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরী স্যার আমাকে জানালেন ষোলশহরে শিক্ষার্থীরা আটকা পড়েছে। আমি গিয়ে যেন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করি। এক ছোট ভাইয়ের মোটরসাইকেলে ক্যাম্পাস থেকে ষোলশহরে যাই। গিয়ে দেখি শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত ও উত্তেজিত অবস্থায় রয়েছে। গভীর রাতে স্টেশন এলাকায় ছাত্রীদের চোখেমুখেও আতংকের ছাপ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাকে ভাবিয়ে তুলে। মোবাইলে বিষয়টি প্রক্টর স্যারকে জানাই। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচে বাস ঠিক করে সকল শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসে আনার ব্যবস্থা করতে আমাকে নির্দেশ দেন। রাত একটু বেশি হলেও ক্যাম্পাসে যে শিক্ষার্থীরা যে নিরাপতে ফিরতে পেরেছে সেটিই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

উল্লেখ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট নিরসন, শাটলট্রেনের বগি বৃদ্ধি, বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী কর্র্তৃক বিএনপি-জামায়াতের নিয়োগকৃত লোকদের চাকরি বাতিল করাসহ আট দফা দাবিতে বুধবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধের ডাক দেয় মুক্তিযুদ্ধে চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষার্থীবৃন্দের ব্যানারে ছাত্রলীগ। মঙ্গলবার রাতে তারা বিশ্ববিদ্যালয়গামী শাটলট্রেনের চালককে ষোলশহর স্টেশন থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

এসআর/একুশে