চট্টগ্রাম: ২০১২ সালের শেষের দিক থেকে বদলে যেতে শুরু করেন সাব্বিরুল হক কণিক। পরিবর্তন আসে তার কথাবার্তা ও চালচলনে। ২০১৪ সালের শুরু থেকেই কণিক বলতে থাকেন, স্বজনদের ধর্মকর্ম শুদ্ধ নয়; তাদেরকে অনৈতিক, অনৈসলামিক বলেও গালি দিতেন। জামাতে নামাজ পড়ার জন্য যেতেন নগরীর বাকলিয়া থানার গোলবাগ আবাসিক এলাকার মাইকবিহীন মসজিদে। এরপর থেকে তাবলিগের কথা বলে মাঝে মাঝে সপ্তাহ-দশদিনের জন্য উধাও হয়ে যেতেন। বছরখানেক আগে একবার তিন মাসের জন্য নিরুদ্দেশ থাকার পর বাসায় ফিরে আসেন। সর্বশেষ গত ২১ ফেব্রুয়ারি ঘর থেকে বেরিয়ে আর ফিরেননি কণিক। এত দীর্ঘ সময় ধরে এসব কাজ হলেও নির্বিকার ছিলেন কণিকের বাবা আজিজুল হক চৌধুরী।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বরুমছড়া ইউনিয়নের ফুলগাজীপাড়ার আজিজুল হকের দাবি, রাজধানীর কল্যাণপুরে নিহতদের যে ছবি পুলিশ প্রকাশ করেছে, এরমধ্যে ছবির অষ্টম যুবক তার ছেলে সাব্বিরুল হক কণিক।
বরুমছড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগের সাবেক পরিদর্শক ছিলেন আজিজুল হক চৌধুরী বলেন, বড় ছেলে সাব্বির গত ২১ ফেব্রুয়ারি থেকেই নিখোঁজ। কল্যাণপুরে নিহতদের মধ্যে সাব্বির রয়েছে, সেটা আমরা ছবি দেখে অনেকটা নিশ্চিত হয়েছি। শুধু চোখগুলোর মধ্যে মিল পাচ্ছি না। ঢাকায় গিয়ে লাশ সনাক্ত করবো। কণিকের লাশ হলে, আমি তা গ্রহণ করবো না।
বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আজিজুল হকের সাথে কথা হয়। ছেলে নিখোঁজ হওয়া ও অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করার পরও কেন পুলিশকে জানাননি প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি বরুমছড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার বড়ভাইও ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন। আমাদের পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত। জঙ্গিবাদকে আজীবন ঘৃণা করে এসেছি। ছেলের কর্মকান্ডে রাগে দুঃখে নিশ্চুপ ছিলাম, পুলিশকেও জানাইনি।
এদিকে আজিজুল হক চৌধুরীর তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে সাব্বিরু হক কণিক সবার বড়। চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে গোল্ডেন জিপিএ-৫ নিয়ে এসএসসি এবং ২০১২ সালে কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন কণিক। এরপর আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) এর কুমিরা ক্যাম্পাসের ইকনোমিক্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে ভর্তি হন। নিখোঁজ হওয়ার আগে তিনি ওই বিভাগের চতুর্থ সেমিস্টারের ছাত্র ছিলেন।
কণিকের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ‘আইডি নাম্বার দুই’ নামের একটি আইডি থেকে চাচাতো ভাই-বোনদের সাথে কথা বলে কণিক। ওই আইডি থেকে চাচাতো বোন আনজুমানকে জানান, তিনি বিয়ে করেছেন। কিন্ত কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কিছুই বলেননি।
বুধবার এই আইডি’র ওয়ালে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো ওয়াল কোরআন-হাদিসের আলোকে নানা স্ট্যাটাসে ভরা। এই আইডিতে অস্ত্র তাক করা এক জঙ্গির ছবি প্রোফাইল পিকচার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারিতে। আছে উট নিয়ে দৌড়ের ছবিও। ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারিতে একটি স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন- ‘কিছু আবর্জনা আনফ্রেন্ড করেছি। কেননা তারা আমার জন্য নিরাপদ ছিল না। এখন থেকে দ্বীনি ভাই-বোন-বন্ধুরাই এখানে স্থান পাবে।’
২০১৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি লিখেছেন- ‘বিজয় তখনই আসবে; যখন আমরা একেক জন ‘ইবাদিয়াছ ছালেহুন’ বান্দা হিসেবে নিজেদেরকে আল্লাহর কাছে পেশ করতে পারবো।’
২০১৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লিখেছেন- ‘আপনি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করছেন, দোয়া দরুদ পড়ছেন। তবুও আপনার দোয়া কবুল হচ্ছে না। কারণ আপনার নামাজ যথাযথভাবে আদায় হচ্ছে না।’
এদিকে সাব্বিরুল হক কণিকের স্বজন ও পারিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নগরীর বাকলিয়া থানার গোলবাগ আবাসিক এলাকায় মাইকবিহীন মসজিদে নামাজ পড়তেন কণিক। সেসময় তিনি বলতে থাকেন, তিনি ছাড়া স্বজন-শুভার্থী কারো ধর্মকর্ম শুদ্ধ নয়। অনৈতিক, অনৈসলামিক বলেও কাছের লোকদের গালি দিতেন।
এদিকে বুধবার সাব্বিরুল হক কণিকের বাবা আজিজুলকে ডেকে নিয়ে কথা বলেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ ও জেলা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে মূলত পুলিশ আজিজুলকে ডাকে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নুরেআলম মিনা বলেন, রাউজানে এক বিয়েতে যাওয়ার কথা বলে ঘর থেকে বের হয়ে সাব্বিরুল হক কণিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে আমাদেরকে জানায় তার বাবা। তিনি আরো জানিয়েছেন, ধর্মের বিষয় নিয়ে সাব্বিরুল সবসময় তর্ক করতো। আমরা তাকে ছবি দেখালে, তিনি জানিয়েছেন ছবিতে থাকা যুবকের চোখ আর সাব্বিরুলের চোখের মধ্যে তিনি অমিল দেখতে পাচ্ছেন। তবে তিনি এ ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চিত বলে জানিয়েছেন। এখন লাশ সনাক্ত করার জন্য তিনি ঢাকায় যাবেন বলেছেন, তবে লাশ তার ছেলের হলে তিনি গ্রহণ করবেন না বলে জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য্য বলেন, বাকলিয়া কালামিয়া বাজার সংলগ্ন ইসহাকের পুল এলাকার একটি বাসায় আজিজুল হক বসবাস করলেও তার ছেলে সাব্বিরুল, সীতাকুন্ডে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে থাকতেন। এ বিষয়টা নিয়ে আমরা বিস্তারিত খোঁজখবর নিচ্ছি।
