কুকুর লেলিয়ে হিমু হত্যায় পাঁচজনের মৃত্যুদন্ড

chittagong courtচট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে কুকুর লেলিয়ে ছাদ থেকে ফেলে শিক্ষার্থী হিমাদ্রি মজুমদার হিমুতে হত্যার মামলার পাঁচজনকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন আদালত। রোববার বিকেলে চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ নুরুল ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদন্ড পাওয়া পাঁচ আসামি হলেন- শাহ সেলিম টিপু, তার ছেলে জুনায়েদ আহমেদ রিয়াদ এবং রিয়াদের তিন বন্ধু শাহাদাত হোসেন সাজু, মাহাবুব আলী খান ড্যানি এবং জাহিদুল ইসলাম শাওন। এদের মধ্যে শাহ সেলিম টিপু, শাহাদাত হোসেন সাজু ও মাহাবুব আলী ড্যানি রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। অপর দুই আসামি জুনায়েদ আহমেদ রিয়াদ শুরু থেকে এবং জাহিদুল ইসলাম শাওন জামিনে গিয়ে পলাতক আছেন।

রাষ্ট্রপ¶ের আইনজীবি অ্যাডভোকেট অনুপম চক্রবর্তী বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে ৩০২/৩৪ ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। ফলে আদালত পাঁচজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দিয়েছে। এখন নিয়ম অনুযায়ী আসামিরা সাত দিনের মধ্যে এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। তবে পলাতক আসামিদের সেই সুযোগ পেতে হলে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

এদিকে ঘোষিত রায়ে নিজের সন্তুষ্ট হওয়ার কথা জানিয়েছেন হিমাদ্রির বাবা প্রবীর মজুমদার। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম আমার পাশে থাকায় আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি। এই রায়ে আমি সন্তুষ্ঠ। সরকারের এজেন্সিগুলো তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারলে, আসামিরা উচ্চ আদালতে গিয়েও একই শাস্তি পাবে।’

নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন জানিয়ে প্রবীর মজুমদার বলেন, ‘চার বছর ধরে বিচারের আশায় ঘুরেছি। যুক্তি-তর্কে ১০ মাস গেল। রায় পেছাল দুবার। খুব টেনশনে ছিলাম। দ্বিতীয় দফায় রায় পেছানোয় মনে সংশয়ও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন ন্যায়বিচার পেয়ে আমি খুশি। হিমুর মৃত্যুর পর আসামিপ¶ বারবার সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল। নানা চাপ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মামলা থেকে সরে দাঁড়াতে আমরা রাজী হয়নি। এখন তারা আমার ক্ষতি করতে পারে। এক কথায় আমি, নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছি।’

অন্যদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবি অ্যাডভোকেট জুয়েল দাশ বলেন, ‘সত্যি বলতে আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। এই রায়ে আমরা খুবই মর্মাহত। আমরা সব ধরনের তথ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করেছি। আমার মক্কেলরা নির্দোষ। প্রত্যেকটা আসামিকেই সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হল। এতে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়েছে। আমরা উচ্চ আদালতে যাব। আশা করছি উচ্চ আদালতে ন্যায়বিচার পাব।’

প্রসঙ্গত মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় ২০১২ সালের ২৭ এপ্রিল নগরীর পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ‘ফরহাদ ম্যানশন’ নামের ১০১ নম্বর বাড়ির চারতলায় হিমুকে হিং¯্র কুকুর লেলিয়ে দিয়ে নির্যাতন করে সেখান থেকে নিচে ফেলে দেয় কয়েকজন বখাটে যুবক। এরপর ২৬ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান হিমু।
পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ইংরেজি মাধ্যমের সামারফিল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের ‘এ’ লেভেলের শি¶ার্থী ছিলেন হিমু। এ ঘটনায় হিমুর মামা প্রকাশ দাশ অসিত বাদি হয়ে পাঁচলাইশ থানায় পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।

২০১২ সালের ৩০ অক্টোবর পাঁচলাইশ থানা পুলিশ ওই মামলায় এজাহারভুক্ত পাঁচজন আসামিকে অন্তর্ভুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। অভিযোগপত্র দেওয়ার প্রায় দেড় বছর পর ২০১৪ সালের ৩ ফেব্রæয়ারি অভিযোগ গঠন করে আদালত। একই বছরের ১৮ ফেব্রæয়ারি শুরু হয় সা¶্যগ্রহণ। আদালতে হিমুর মামা শ্রীপ্রকাশ তার সা¶্যে বলেন, ‘স্থানীয় মাদকবিরোধী সংগঠন শিকড়ের সদস্য ছিলেন হিমু। আর এ মামলার আসামিরা মাদক বিক্রিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১১ সালের ২৬ অক্টোবর শিকড়ের প¶ থেকে এম ইসমাইল নামের একজন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করলে ওই সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে আসামিদের বিরোধের সূত্রপাত হয়। মূলত মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ার কারণেই কুকুর লেলিয়ে হিমুকে হত্যা করা হয়।’

এরপর ১৮ অক্টোবর পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। সা¶্যগ্রহণ শেষে ২০১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে প্রায় সাড়ে ১০ মাস পর ২৮ জুলাই রায় ঘোষণার কথা ছিল। কিন্তু বিচারক ছুটিতে থাকায় তা পেছানো হয়েছিল। পরে ১১ আগস্ট রায় ঘোষণার সময় নির্ধারণ করেন আদালত। কিন্তু ওইদিন ‘ফুল কোর্ট রেফারেন্স’ হওয়ায় ১১ আগস্ট রায় ঘোষণা হয়নি। পরে রায় ঘোষণার নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয় ১৪ আগস্ট।