‘৯০ এর পর দেশের সব নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে : এরশাদ

ঢাকা : ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মিলিত জাতীয় জোটের মহাসমাবেশ থেকে ১৮ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ‘সুশাসনের লক্ষ্যে ও জাতির মুক্তির পথে’ শীর্ষক এই ১৮ দফা ঘোষণা করেন তিনি।

এই ১৮ দফার মধ্যে প্রাদেশিক সরকার গঠন করে প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, নির্বাচন পদ্ধতি ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কার ও পুনর্গঠন এবং সন্ত্রাসদমনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার রয়েছে।

এরশাদ বলেন, “এটা হল মুক্তির পথ, দেশের মুক্তির পথ, জাতির মুক্তির পথ। দেশবাসীর কাছে কিছু বার্তা পৌঁছে দিতে চাই।”

শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়া এই মহাসমাবেশ জাতীয়পার্টির সিনিয়র কো চেয়ারম্যান সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, কো চেয়ারম্যান জি এম কাদের, জাতীয় পার্টির মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারসহ প্রেসিডিয়াম সদস্যরা এবং জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, জাতীয় ইসলামী মহাজোটের নেতারাও মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

এরশাদ বলেন, ”আমরা ক্ষমতায় এসে প্রাদেশিক সরকার করতে চাই। আমরা প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ করতে চাই। আমরা পূর্ণাঙ্গ উপজেলা পরিষদ গঠন করতে চাই।”

নব্বইয়ের পর অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচন ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ হয়েছে মন্তব্য করে সাবেক সামরিক শাসক এরশাদ আবার ক্ষমতায় গেলে নির্বাচন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দেন।

সমাবেশে তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি ও সম্মিলিত জাতীয় জোট ক্ষমতায় গেলে ‘ধর্মীয় মূল্যবোধকে’ প্রাধান্য দেওয়া হবে। তবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণে তাদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা হবে।

ক্ষমতায় গেলে বিচার বিভাগের ‘স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদ।

তিনি বলেন, “আমরা শিল্পায়ন করব। তবে জ্বালানি ও বিদ্যুতের জন্য ফসলি জমি নষ্ট করে নয়। এমনিতেই ফসলি জমি কম। নষ্ট করলে আমরা অনাহারে থাকব। আমরা খাদ্যে নিরাপত্তা আনব।”

জোটের এই সমাবেশে চলমান শিক্ষা ব্যবস্থারও সমালোচনা করেন এরশাদ। তিনি বলেন, বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি জাতিকে ‘অন্ধকারের দিকে’ নিয়ে যাচ্ছে। তিনি এর সংস্কার চান, পরিবর্তন চান।

দেশে স্বাস্থ্য সেবা খাত এবং পরিবেশ নিয়ে নতুন নীতি প্রণয়ণের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাশাপাশি এরশাদ বলেন, “আমরা সড়কে নিরাপত্তা চাই। বাচ্চারা যখন বলে, সরকারের মেরামত প্রয়োজন, আমরাও সে কথা বলি।”

মহাসমাবেশে এরশাদ বলেন, এবার তারা ‘জোটবদ্ধভাবে’ ৩০০ আসনে নির্বাচন করবেন। তবে একাদশ নির্বাচন কেমন হবে, তা নিয়ে তার সংশয় আছে।

“একটি দল ৭ দফা দিয়েছে, সরকার তা মানতে রাজি নয়। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী মানা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় আগামী দিনগুলো স্বচ্ছ দিন হবে বলে মনে হয় না আমার।”

সরকার নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের যে প্রক্রিয়ার কথা বলছে, তাতে সকল দলের সমন্বয় থাকতে হবে বলে মত দেন এরশাদ।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা বলেছি, জোটগতভাবে ৩০০ আসনে আমরা নির্বাচন করব। আমরা জাতীয় পার্টি সব সময় নির্বাচন করেছি। আজও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। তবে দেশের স্বার্থে নতুন মেরুকরণ হতে পারে।“

জাতীয় পার্টির চেয়ারর‌্যান বলেন, “নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে জাতীয় পার্টি অবশ্যই ক্ষমতায় আসবে। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা চাই।”

নির্বাচন ঘিরে জাতীয় পার্টির গণসংযোগ এবং প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলার কথা জানিয়ে এরশাদ বলেন, “জোটের শরিকরা তাদের প্রার্থীর তালিকা দিয়েছেন। তবে আমি বলব, এখানে দলের চেয়ে প্রার্থীর যোগ্যতাই বেশি প্রাধান্য পাবে।”

এরশাদ সমাবেশে নিজেকে দেশের ‘সবচেয়ে বর্ষীয়ান ও নিপীড়িত’ রাজনীতিবিদ হিসেবে দাবি করেন।

তিনি বলেন, “ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পর এত নির্যাতন, নিপীড়ন, অত্যাচার সহ্য করেছি, পৃথিবীর ইতিহাসেব আর কোনো রাজনীতিবিদ সহ্য করেনি। ৯০ সালে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পর আমি আনন্দে ঘুমাতে পারি নাই। শঙ্কা ছিল, কখন জেলে যাব।”

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে তার রাজনৈতিক জীবনের ‘শেষ নির্বাচন’।

শনিবারের সমাবেশে তিনি বলেন, “এই শেষ জীবনে আমার জীবনটাকে দেশ ও জাতির জন্য উৎসর্গ করলাম। দেশবাসীর কাছে একটাই আবেদন, আমাকে দোয়া করবেন, যেন জাতীয় পার্টিকে আমরা ক্ষমতায় আনতে পারি।”

এই মহাসমাবেশ ঘিরে গত কয়েক দিন ধরেই দলীয় নেতাদের ছবিসহ ‘চলো চলো, ঢাকা চলো’ স্লোগানে পোস্টার ও ব্যানার দেখা যাচ্ছিল ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায়।

গত ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় পার্টির এক যৌথসভায় এরশাদ ৬ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দীতে এই মহাসামবেশ করার ঘোষণা দিলেও তার সিঙ্গাপুর সফর এবং বিভিন্ন জেলা ও মহানগরের সম্মেলনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে মহাসমাবেশের তারিখ পিছিয়ে ২০ অক্টোবর নতুন তারিখ রাখা হয়।