চট্টগ্রাম : নগরীর একটি সরকারি কলেজের অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্রী সাবরিনা আক্তার (ছদ্মনাম)। চলতি বছরের শুরুর দিকে ইয়াবাআসক্ত হয়ে পড়েন ধনাঢ্য পরিবারের এই তরুণী। গত মাস দুয়েক আগে বিষয়টি নজরে আসার পর স্বজনরা ছুটোছুটি করেন বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে। কিন্তু ইয়াবাআসক্ত ওই তরুণীকে কোথাও ভর্তি করানো যায়নি। এদিকে সম্মানহানির কথা ভেবে ওই তরুণীকে নগরীর চকবাজারের একটি ছাত্রীনিবাসে রেখে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে আপাতত ‘ভারমুক্ত’ হয়েছে পরিবারটি! শেষপর্যন্ত সাবরিনার চূড়ান্ত পরিণতি কী হতে যাচ্ছে- তা কেউই জানে না।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসেবে, কাগজে-কলমে চট্টগ্রামের ১১৫ মাদকাসক্ত পুরুষ আবাসিক চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন! বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ৮টি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে শয্যা সংখ্যা ১১০টি। আর চট্টগ্রামের সরকারি মাদকনিরাময় কেন্দ্রে শয্যা ৫! পুরুষদের জন্য এই অপ্রতুল চিকিৎসাব্যবস্থা থাকলেও নারী মাদকাসক্তদের জন্য তা-ও নেই!
তরী, আর্ক ও অংকুর নামের তিনটি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ২০টি করে শয্যা রয়েছে। ১০টি করে শয্যা রয়েছে নয়ন, প্রশান্তি, দীপ, দৃষ্টি ও দীপ্তি নামের পাঁচটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে। অন্যদিকে চট্টগ্রামের সরকারি মাদকনিরাময় কেন্দ্রে শয্যা সংখ্যা মাত্র ৫টি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামে মাদকসেবীর সংখ্যা দুই লাখের কম হবে না। মাদকসেবীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে ইয়াবা সেবনকারী নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তবে লোকলজ্জা ও সামাজিকতার ভয়ে মাদকাসক্তির বিষয়টি লুকিয়ে রাখছেন অনেকেই। এছাড়া বেসরকারি মাদকনিরাময় কেন্দ্রগুলোর ব্যয়ভার দরিদ্র মানুষের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। এসব কারণে মাদকসেবীর তুলনায় মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে খুব বেশি মানুষ সেবা নিতেও যান না।
অথচ ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, বাধ্যতামূলকভাবে বিনা খরচে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা করানোর দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। চিকিৎসায় পুরুষের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা থাকলেও নারীদের জন্য নেই। এছাড়া জেলা অনুযায়ী মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির বিধান থাকলেও তা কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে।
এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের চট্টগ্রাম মেট্টো অঞ্চলের উপ-পরিচালক আলী আসলাম বলেন, ‘মাদকাসক্তের সংখ্যার তুলনায় চিকিৎসা ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল। পুরুষদের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকলেও নারী মাদকাসক্তদের আবাসিক চিকিৎসার সুযোগ নেই। এসব সমস্যা সমাধানে আমরা সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা হাতে নেব।’
এদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগেও মাদকাসক্তদের চিকিৎসার সুযোগ আছে। কিন্তু ওই ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া প্রত্যেক রোগীর সাথে স্বজনদের একজনকে সার্বক্ষণিক অবস্থান করার নিয়ম রয়েছে। যার কারণে হয়তো সেখানে চিকিৎসা সেবা নিতে যান না মাদকাসক্তরা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নিজের অফিসে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারি পরিচালক মোঃ দিদারউল ইসলাম বলেন, ‘মাদকাসক্তি একপ্রকার মানসিক রোগ। তবে মানসিক রোগ বিভাগের ওয়ার্ডে মাদকাসক্তরা চিকিৎসা নিতে আসেন না। মাদকাসক্ত কেউ কোনো সময় ভর্তি হতে এসেছিল কিনা- তা আমি জানি না।’
