ঢাকা: আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)। বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী রাহমাতুল্লিল আলামিন সাইয়েদুল মুরসালিন খাতামুন্নাবিয়ীন তাজেদারে মদীনা জগতকুল শিরোমণি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা আহমদ মুজতাবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলা আলিহী ওয়া সাল্লামের জন্ম ও ওফাত দিবস। আজ থেকে প্রায় ১৫শ’ বছর পূর্বে ৫৭০ খৃস্টাব্দে এ দিনে সুবহে সাদেকের সময় মক্কা নগরীর সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে মা আমেনার কোল আলো করে প্রিয় নবী (দ.) আসেন এই ধরায়। জন্মের পূর্বেই পিতৃহারা হন এবং জন্মের অল্পকাল পরই বঞ্চিত হন মাতৃস্নেহ থেকে। অনেক দুঃখ-কষ্ট আর অসীম প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে বড় হয়ে ওঠেন হযরত মুহাম্মদ (দ)। চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হওয়ার পর তিনি মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নবুওয়তের মহান দায়িত্ব লাভ করেন। অসভ্য বর্বর ও পথহারা মানব জাতিকে সত্যের সংবাদ দিতে তিনি তাদের কাছে তুলে ধরেন মহান রাব্বুল আলামীনের তাওহীদের বাণী।
কেবল তাঁর অনুসারীদেরই নন, জাতি-ধর্ম বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের আদর্শ ও পথ প্রদর্শক প্রিয় নবী (দ.)। পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক বলেছেন, আপনাকে আমি জগৎসমূহের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি। মহানবী (দ) বিশ্বমানবের জন্য আল্লাহ নির্ধারিত সেরা পথ প্রদর্শক, মহান শিক্ষক ও অনুপম আদর্শ। মানবেতিহাসের এক যুগসন্ধিকালে, অন্ধকারতম সময়ে তিনি মহান আল্লাহর বাণী নিয়ে অবতীর্ণ হন। তার উদাত্ত আহ্বান, নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মসাধনা, উচ্চতম নীতি আদর্শ ও অমলিন পবিত্র-মাধুর্যের মাধ্যমে তিনি অতি অল্প দিনে এক আলোকোজ্জ্বল ও সর্বোন্নত জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেন। অজ্ঞানতা, কুসংস্কার এবং অনাচার, পাপাচার ও বিশ্বাসহীনতার কলুষ দূরীভূত করে শান্তি, সভ্যতা, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার এক নতুন পথ রচনা করেন। বিশ্বাস, প্রজ্ঞা ও মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ নয়া সভ্যতার স্থপতি হিসেবে তিনি কেবল আরবীয়দের নয়, গোটা বিশ্বের মানুষের মুক্তির দিশা দান করেন। মহান আল্লাহর একমাত্র মনোনীত ধর্ম ইসলামের বাণী বাহক হিসেবে তিনি মানুষের ধর্মীয় জীবনেই প্রভাব বিস্তার ও সুনির্দিষ্ট করেননি, মানব জীবনের এমন কোনো দিক বিভাগ নেই যেখানে তাঁর অনিবার্য প্রভাব প্রতিফলিত হয়নি। তিনি একাধারে একটি ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা, একটি জাতির নির্মাতা এবং একটি অতুল্য সভ্যতার স্রষ্টা। তাই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, রাহবারও তাকে বলা হয় সাইয়েদুল মুরসালিন ও খাতামুন্নাবিয়ীন।
রাসুলে করীম (দ) ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করলে অসভ্য-বর্বর আরব জাতি তাঁর (দ.) দাওয়াত গ্রহণ না করে নির্যাতন শুরু করে। বিভিন্নমুখী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করতে থাকে একের পর এক। আল্লাহর সাহায্যের ওপর ভরসা করে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম চালিয়ে যান তিনি। ধীরে ধীরে সত্যান্বেষী মানুষ তাঁর সাথী হতে থাকেন। অন্যদিকে কাফেরদের ষড়যন্ত্রও প্রবল আকার ধারণ করে। এমনকি একপর্যায়ে তারা রাসুল (দ.) কে হত্যার পরিকল্পনাও গ্রহণ করে। রাসুল (দ.) আল্লাহর নির্দেশে জন্মভূমি ত্যাগ করে মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় তিনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করেন এবং মদীনা সনদ নামে একটি লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করেন। মদীনা সনদ বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান হিসাবে খ্যাত। এ সংবিধানে ইহুদী, খৃষ্টান, মুসলমানসহ সকলের অধিকার স্বীকৃত হয় সমান্তরালে।
২৩ বছর শ্রম সাধনায় রাসুলে পাক (দ.) দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিজয় অর্জন করেন। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তা পূর্ণতা লাভ করে। বিদায় হজের ভাষণে তিনি আল্লাহর বাণী শুনিয়েছেন মানবজাতিকে ‘আজ থেকে তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন তথা জীবনব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ করে দেয়া হলো। তোমাদের জন্য দ্বীন তথা জীবনব্যবস্থা হিসাবে একমাত্র ইসলামকে মনোনীত করা হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (দ.) ইতিহাসের অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। অন্য ধর্মাবলম্বীরাও তাঁকে মানবজাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারক ব্যক্তিত্ব হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। হযরত মুহাম্মদ (দ.) এর ওপর নাযিল হয় ঐশী গ্রন্থ আল কোরআন। এখনো পর্যন্ত সারাবিশ্বে নির্ভুল, বহুল পঠিত হিসেবে বিবেচিত একমাত্র গ্রন্থ আল কোরআন।
প্রতি বছর ১২ রবিউল আউয়ালকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসাবে পালন করে সারা মুসলিম বিশ্ব।
এ উপলক্ষে জমায়েত হয়ে নবীজীর জীবনী আলোচনা করে এবং কাসীদা পড়ে থাকে। মিষ্টি-খাবার প্রভৃতি তৈরি করে বিতরণ করে। রাসুল প্রেমিকরা ভক্তিভরে দরুদ পাঠে মশগুল থাকেন। বের করা হয় বর্ণাঢ্য র্যালি বা জশনে জুলুস। আজ সরকারি ছুটির দিন। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে দেশবাসীসহ মুসলিম উম্মাহকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ আমাদের সকলের জীবনকে আলোকিত করুক, আমাদের চলার পথের পাথেয় হোক, মহান আল্লাহর কাছে এ প্রার্থনা করি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহানবী (সা.)-এর সুমহান আদর্শ অনুসরণের মধ্যেই প্রতিটি জনগোষ্ঠীর অফুরন্ত কল্যাণ, সফলতা ও শান্তি নিহিত রয়েছে। আজকের দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় বিশ্বে প্রিয়নবী (সা.)-এর অনুপম শিক্ষার অনুসরণের মাধ্যমেই বিশ্বের শান্তি, ন্যায় এবং কল্যাণ নিশ্চিত হতে পারে।
