চট্টগ্রামে নৌকার মাঝি হলেন যারা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন চিঠি পেয়েছেন ১৫ প্রার্থী। ১৬ টি সংসদীয় আসনে মনোনয়নপ্রাপ্তদের মধ্যে নতুন মুখ হিসেবে রয়েছেন মাত্র একজন। বাকী সকলেই বর্তমান সাংসদ হিসেবে বহাল রয়েছেন।

দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্তরা হলেনঃ চট্টগ্রাম-১ আসনে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, চট্টগ্রাম-২ আসনে নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী, চট্টগ্রাম-৩ আসনে মাহফুজুর রহমান মিতা, চট্টগ্রাম-৪ আসনে দিদারুল আলম, চট্টগ্রাম-৬ আসনে এ বি এম ফজলে করিম, চট্টগ্রাম-৭ আসনে ড. হাছান মাহমুদ, চট্টগ্রাম-৯ আসনে ব্যরিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রাম- ১০ আসনে ডা. আফসারুল আমিন, চট্টগ্রাম-১২ আসনে সামশুল হক চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৩ আসনে সাইফুজ্জামান জাবেদ, চট্টগ্রাম-১৪ আসনে নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজাম উদ্দিন নদভী।

চট্টগ্রাম-১ আসনে (মিরসরাই) ৬ষ্ঠ বারের মতো নৌকার মনোনয়ন পেলেন বর্তমান সাংসদ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামের এই প্রেসিডিয়াম সদস্য  স্বাধীনতার পর প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ১৯৭৩ সালে। এরপর যথাক্রমে ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

সংসদ সদস্য থাকা কালে আওয়ামী লীগের প্রবীণ এই নেতা ১৯৯৬ সালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি জাতীয় সংসদে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান ও বর্তমান সংসদ সদস্য নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচনের জন্য মনোনীত প্রার্থীর চিঠি পেয়েছেন। মহাজোটের শরিক দল হিসেবে তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে দ্বিতীয়বারের মতো নৌকার টিকেট পেলেন মাহফুজুর রহমান মিতা। তার পিতা প্রয়াত মোস্তাফিজুর রহমান এই আসন থেকেই আওয়ামী লীগের সাংসদ হয়েছিলেন। পিতার উত্তরসূরি হিসেবে তিনিও সে ধারবাহিকতা ধরে রাখলেন। ২০১৪ সালে প্রথম নৌকার টিকেট পেয়েছিলেন তিনি। এর আগে ২০০৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রায় ৩০ হাজার ভোট পেয়ে পরাজিত হন।

চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড-পাহাড়তলী) আসনে দ্বিতীয়বার নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করার জন্য দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য মো. দিদারুল আলম। এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হন দিদারুল আলম। ব্যবসায় থেকে রাজনীতিমুখী হন এই নেতা।

চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে নৌকার টিকেটে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করবেন মহাজোটের অন্যতম শরীক দল জাতীয় পার্টির বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। ২০১৪ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমে পানি সম্পদ মন্ত্রী এবং পরবর্তীতে বন ও পরিবেশ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিনি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য। এছাড়াও তিনি ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

চটগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে পঞ্চমবারের মত মনোনয়ন চিঠি পেয়ে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন বর্তমান সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। একসময়ে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে দলে তার বিকল্প আর কাউকে খুঁজে পায়নি দলীয় হাইকমান্ড। ২০০১ সাল থেকে টানা চারবার আসনটি দলকে উপহার দিয়ে আসছেন তিনি। সর্বশেষ, ২০১৪ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার পর তিনি রেল মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান।

চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে ফের আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেলেন কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক বর্তমান সাংসদ ড.হাছান মাহমুদ। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো নৌকার মাঝি হলেন তিনি। এর আগে ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তার কয়েকমাস পরে তাকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী করা হয়। এর ছয়মাস পর পূর্ণমন্ত্রির দায়িত্ব পান তিনি। সর্বশেষ, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর মন্ত্রীত্বের স্বাদ গ্রহণ না করলেও তিনি বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে রয়েছেন।

ইউরোপে বসবাসকালীন ড.হাছান বৈদেশিক আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে সম্মত হন। এক -এগারোর সময় সময় দলের সিনিয়র অনেক নেতা যখন কারাগার কিংবা আত্মগোপনে তখন কারারুদ্ধ শেখ হাসিনার বিশ্বস্থ সিপাহশালার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন তিনি।

চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যরিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তিনি চট্টগ্রামের প্রয়াত সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে। এই আসনে সর্বশেষ লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টি নির্বাচন করেছিল। এরপর এবারই প্রথম নওফেল নৌকা প্রতীক নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে যাচ্ছেন।

এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী জীবদ্দশায় জাতীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। আঞ্চলিক রাজনীতির এই প্রাণপুরুষ মন্ত্রীত্ব থেকে শুরু করে দলীয় নানা পদের সুযোগ পেয়েও তা গ্রহণ করেন নি৷তবে পিতার পথে না হাঁটলেও, উত্তরাধিকার সূত্রে নওফেল দলে কেন্দ্রীয় নেতা হন।

কিন্তু পদ পেয়ে নিজের সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন বারবার।নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে বিজয় করে আনার পিছনে তার অবদান ছিল ব্যাপক। এই কারণে তরুণদের মধ্যে দলীয় প্রধানের আস্থাভাজন হিসেবে পরিণত হন। সাংগঠনিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি গণমাধ্যমেও সক্রিয় এই তরুণ নেতা।

চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলী-হালিশহর-খুলশী) আসনে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ডা. আফসারুল আমীন। সর্বশেষ, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে চট্টগ্রাম–১০ (পাহাড়তলী–হালিশহর–খুলশী) আসনে ডা. আফছারুল আমীন সাংসদ হন। এর আগে ২০০৮ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনেও সাংসদ হয়েছিলেন সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত ডা. আফছারুল আমীন।

চট্টগ্রাম-১২(পটিয়া) আসনে তৃতীয়বার নৌকার মনোনয়ন পেলেন বর্তমান সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সাংসদ হন। তারই ধারাবাহিকতায় একাদশ সংসদ নির্বাচনেও এই আসনে জয়লাভ নিশ্চিত করতে তার ওপর আস্থা রেখেছে দল।

চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা) আসনে দলীয় মনোনয়ন পেলেন বর্তমান সাংসদ সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। পিতার হাত ধরেই রাজনীতিতে আসেন তিনি। মূলত ব্যবসায়ী হিসেবেই তার পরিচিতি। ২০০৮ সালে এই আসনেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল তার বাবা আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু। তিনি সংসদ সদস্য থাকাকালীন মারা যাওয়ায় তার আসনে উপ-নির্বাচন করেন ছেলে জাবেদ। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে মনোনয়ন পেয়ে ফের সংসদ সদস্য হন তিনি। বর্তমানে ভূমি প্রতিমন্ত্রির দায়িত্ব পালন করছেন।

চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া) আসন থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম। এর ফলে দ্বিতীয়বারের মতো নৌকার টিকেট পেলেন তিনি। এর আগে ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো আওয়ামীলীগের হয়ে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নজরুল ইসলাম। এরপর থেকে চন্দনাইশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। ক্লিন ইমেজের রাজনীতির কারণে এলাকায় রয়েছে তার একচ্ছত্র জনপ্রিয়তা।

চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া) আসনে দ্বিতীয়বারের মতো নৌকার মনোনয়ন পেলেন ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজাম উদ্দিন নদভী। শুরুতেই জামায়তের সাথে সখ্যতার কারণে আলোচিত ছিলেন তিনি। কিন্তু নিজ আসনে উন্নয়ন কর্মকান্ড অব্যাহত রেখে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। জামায়াত অধ্যুষিত আসনটিতে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতেও সাংগঠনিক তৎপরতা চালান এই সাংসদ। ২০১৪ সালে এই আসনে প্রথম সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি। তার ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনেও দলের প্রার্থী হলেন।

একুশে/আরএইচ