
শরীফুল রুকন : বিএনপি নেতারা যেখানে একের পর এক মামলার আসামি হচ্ছেন, সেখানে ব্যতিক্রম শুধু দলটির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। ১৯৯৯ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামের কোনো থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। সর্বশেষ ঢাকার পল্টন থানার একটি মামলার আসামি হয়েছিলেন চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল্লাহ আল নোমান, তাও ২০১৫ সালে। এর আগে ২০১৩ সালে ঢাকার বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে ৭টি মামলা হয়েছিল। যদিও সব মামলার কার্যক্রম এখন স্থগিত এবং তিনি জামিনে আছেন।
ছাত্রজীবনে বাম ধারার রাজনীতি করা আবদুল্লাহ আল নোমান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। জিয়াউর রহমানের সময় বিএনপিতে যোগ দেয়ার পর তিনি শ্রমিক দলের সহসভাপতি মনোনীত হন। চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসন থেকে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য হয়ে আবদুল্লাহ আল নোমান দুই মেয়াদে মন্ত্রীও হন। সর্বশেষ তিনি খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সংস্কারপন্থী মনোভাবের কারণে ২০০৯ সালের কাউন্সিলে প্রথমে নোমানকে কমিটিতেই রাখেননি খালেদা জিয়া। পরে ভাইস চেয়ারম্যানের পদ পান ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে রাজনীতি করে আসা আবদুল্লাহ আল নোমান।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় নোমানের উল্লেখ করা তথ্যানুযায়ী, অতীতে নাশকতা ও বিস্ফোরক আইনে তার বিরুদ্ধে ৬টি মামলা দায়ের হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি মামলা ঢাকার মতিঝিল থানায় ১৯৯৯ সালে দায়ের হয়। একই বছর চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানায় তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের হয়েছিল। এর আগে ১৯৯৬ সালে পাঁচলাইশ থানার একটি মামলায় নোমানকে আসামি হতে হয়। তবে অতীতের এই ছয় মামলার সবকটিতে তিনি অব্যাহতি পেয়ে গেছেন।
সর্বশেষ গত ৬ মে গাজীপুরে আবদুল্লাহ আল নোমানকে আটক করেছিল পুলিশ। তবে আটকের ৫ ঘণ্টা পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।
বর্তমানে হাজিরা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও পুলিশ-আতঙ্কে দৌড়ের ওপর আছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির ২৭৩ জনের কমিটির বেশির ভাগ নেতা নাশকতার একাধিক মামলার আসামি। দলটির চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম, নগর কমিটির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, সহ সভাপতি ইকবাল চৌধুরী, সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করসহ অনেকেই এখন কারাবন্দী। ডা. শাহাদাতের বিরুদ্ধে এখন রয়েছে নাশকতার ৪০ মামলা। এমন অবস্থায় নিজেকে ‘ভাগ্যবান’ মনে করতে পারেন আবদুল্লাহ আল নোমান।
বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা হয়ে মামলায় আসামি না হওয়াটা দোষের কিছু নয়। অপরাধ না করলে কাউকে মামলায় অভিযুক্ত করা হবে না- এটাই নিয়ম। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপি নেতারা যেভাবে গণহারে আসামি হচ্ছেন- সেখানে নোমানের মামলা এড়ানোর বিষয়টি একেবারেই ব্যতিক্রম, অস্বাভাবিক!
তবে কি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলছেন নোমান? জবাবে চট্টগ্রাম নগরের একটি থানার ওসি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটা হতে পারে। লিয়াজো থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। নোমানের অনুসারীদের মাঠে সক্রিয় দেখা যায় না। তিনি ক্লিন ইমেজের মানুষ। সিনিয়র নেতা। তাকে হুমকি হিসেবে মনে করা হয় না। যার কারণে তাকে মামলায় জড়ানোর ব্যাপারে আগ্রহ থাকে না।’
এদিকে হলফনামার তথ্যমতে, ১০ বছরের ব্যবধানে আবদুল্লাহ আল নোমানের সম্পদ বেড়েছে। ২০০৮ সালে নির্বাচনের সময় তার কাছে নগদ ছিল ২৪ লাখ টাকা। এখন নোমানের কাছে নগদ আছে ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ১০ বছরের ব্যবধানে নগদ টাকা বেড়েছে ২৩ গুণ। ১০ বছর আগে আবদুল্লাহ আল নোমানের অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল ৯৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা। তার স্ত্রীর ছিল ৮৮ লাখ ৮ হাজার টাকা। এখন নোমানের সম্পত্তি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকায়। আর স্ত্রীর ২৬ কোটি ১৯ লাখ টাকায়।
সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানতে ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন আবদুল্লাহ আল নোমান। চট্টগ্রামের ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটিকে ঋণ দিয়েছেন ১১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। একই বিশ্ববিদ্যালয়কে তার স্ত্রী ঋণ দিয়েছেন ২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। আবদুল্লাহ আল নোমানের স্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে ৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকার। ১০ বছর আগে স্থাবর সম্পত্তি ছিল ৮৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকার। এখন তার ৫ কোটি ৪২ লাখ টাকার সম্পত্তি আছে।
একুশে/এসআর/এটি
