নোমানকে ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী মানতে নারাজ ডা. আফছারুল (ভিডিও)

রাকীব হামিদ : পাঁচ বছর ধরে মন্ত্রীত্ব, নয় বছরের বেশি সময় ধরে সাংসদ। পিতা ডা. ফজল আমীনের উত্তরসুরী হিসেবে নিযুক্ত হন চিকিৎসাপেশায়। তবে নেশায় তাঁর রাজনীতি। আওয়ামী রাজনীতিতে পরীক্ষিত নিবেদিত ও ত্যাগী নেতা। পরিচিতি আছে সজ্জন, নির্লোভ, নির্মোহ রাজনীতিবিদ হিসেবেও। বলছিলাম চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-পাহাড়তলী-হালিশহর) আসনে নৌকার প্রার্থী ও বর্তমান সাংসদ ডা. আফছারুল আমীনের কথা।

যিনি পঞ্চমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন করছেন। ১৯৯৬ সালে প্রথম ও ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার নির্বাচনে অংশ নিয়ে অল্প ভোটে পরাজিত হন। এরপরের দু’বার বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন তিনি। ২০০৮ সালে নির্বাচিত হলে নৌপরিবহন মন্ত্রালয়ের দায়িত্ব পান। ৬ মাস ১৪ দিনের মাথায় তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী হন। তবে এতো ক্ষমতার ভিড়েও নিজেকে একটুও বদলাননি। চাকচিক্য ও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি তাঁর বাড়ি ও অফিসঘরে।

মঙ্গলবার (১১ ডিসেম্বর) দেওয়ানহাটের মোড়ে তাঁর চেম্বারে গিয়ে দেখা যায়, জীর্ণশীর্ণ কক্ষ, পুরোনো পর্দা, নেই কোনো সাজসজ্জা। ছোট্ট এই অফিসঘরেও বড় বেশি সাদামাটা, সপ্রতিভ আফছারুল আমীন। একটি অনাড়ম্বর টেবিল ঘিরেই তাঁর জগৎ।

ভোটের আর বাকী ১৯ দিন। প্রচারণাও শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। দীর্ঘদিন রাজনীতির সূত্রে ভোটারদের চিন্তাভাবনা পরখ করতে পারেন চট্টগ্রাম-১০ আসনে নৌকার প্রার্থী ডা. আফছারুল আমীন। তিনি মনে করছেন ভোটের সময় তারা সঠিক সিদ্ধান্তই নেবেন।

একুশে পত্রিকাকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এর কারণ হিসবে বলেন, ‘সাধারণ ভোটারেরা চিরাচরিত প্রথায় ভোট দেয়। আমরা তো মাছে-ভাতে বাঙালি। বাঙালিরা কোনটা ভাল কোনটা মন্দ বোঝে। ভোটের সময় তাই এই জাতি সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়। কোথায় ভোট প্রদান করলে দেশ ও জাতির উন্নতি হবে, সার্বিকভাবে প্রতিটি নাগরিক সুফল পাবে ভোটারেরা তা চিন্তা করে।’

ভোটারদের সঠিক সিদ্ধান্ত জানা যাবে ৩০ ডিসেম্বর। কিন্তু তার আগে ডা. আফছারুল আমীনকে নির্বাচনের মাঠে মোকাবেলা করতে হবে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আবদুল্লাহ আল নোমানকে। তাঁরও রয়েছে গ্রহণযোগ্যতা। তবে নোমানকে হেভিওয়েট মানতে নারাজ ডা. আফছারুল আমীন। সব প্রার্থীই সমান তাঁর কাছে। তার মতে মসজিদের সব মুসল্লী যেমন সমান, একইভাবে পরীক্ষার হলের সব পরীক্ষার্থীকে সমান।

ডা. আফছারুল আমীন বলেন ‘হেভি’ শব্দটা রাজনীতির মাঠে কেন ব্যবহার করা হয় তা বোধগম্য নয়। ২০০৮ সালের ফলাফল পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায় হেভি না লাইট। সেদিন মাঠে বিএনপিসহ স্বতন্ত্র, জাতীয় পার্টির প্রার্থীও ছিল। তখন আমি কীভাবে নির্বাচন করেছি তা দেশের সাংবাদিক ও আমার কর্মীরা জানে। সেদিন ‘হেভি’র অবস্থা কী হয়ে গিয়েছিল তাও কারো অজানা নয়। আজ আমার ১০ বছরের কর্মকাণ্ড, নাই মাঝখানে আর প্রার্থী। তাহলে কেন হেভিওয়েট শব্দটা ব্যবহার করা হয় তা জানি না। এটা কি মহিরুহ দেখানোর জন্য কেউ কেউ ব্যবহার করে?’

তাঁর মতে, মসজিদে যারা যায়, সব মুসল্লী সমান। পরীক্ষার হলে সব পরীক্ষার্থী সমান। কবরস্থানের পাশে দাঁড়িয়ে যারা জিয়ারত করে, সব জিয়ারতকারী সমান। প্রার্থী প্রার্থীই, মুসল্লী মুসল্লীই, পরীক্ষার্থী পরীক্ষার্থীই। পরীক্ষার হলে কাউকে বলা হয় না এটা ভাল ছেলে, মেধাবী ছেলে। কুমিল্লা বোর্ডে ১৯৬৬ সালে কলেজিয়েট স্কুল থেকে যে ছেলে স্ট্যান্ড করেছিল, চট্টগ্রাম কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে মনে হয় না সে পাস করেছিল। পাস করে থাকলেও ভালো পাস করতে পারে নাই। নির্বাচনের প্রতিযোগিতায় স্মল, হেভি, লাইট এসব কিছুই নেই।

এবারের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মাঠে থাকবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. আফছারুল আমিন বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনে তারা প্রতিহত করছে। এবার তারা প্রহসন করবে কিনা জানি না। তারা এবারও মাঠে থাকতো না। তারা বাহানা বা অজুহাত দিয়ে সরে যাওয়ার জন্য অনেক সুযোগ কাজে লাগাতো। কিন্তু আইন তাদের বেধে রেখেছে। তারপরেও দেখা যাক, থাকলে ভালো। আর কার ঘরে কে কোন রীতিতে আহারের আয়োজন করবে তা অন্য ঘরে বসে বোঝা বড় মুশকিল।’

তাঁর আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন দলবদল করা একজন ব্যবসায়ী। জোর তদবির চালিয়ে ছিলেন নৌকার টিকেট পেতে। মনোনয়ন দৌঁড়ে পিছনে ফেলেছিলেন আফছারুল আমীনকে। যদিও নানা নাটকীয়তা ও গুঞ্জন শেষে দল তাঁর ওপরই ভরসা রাখে।

দলবদলকারী সেই প্রার্থীকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের রাজনীতি আমি কঠিন করে তুলবো-এটা জিয়াউর রহমানের স্লোগান। রাজনীতি না করে, রাজপথে না হেঁটে, রাজপথে স্লোগান না দিয়ে রাজনীতি করার সিস্টেম ৭৯ সাল থেকে শুরু হয়েছে। ওনি ঐ মতের, পথের ধ্যান-ধারণার বলে একবার পূর্বদিকে যায়, আরেকবার পশ্চিমদিকে যায়। আবার দক্ষিণে চলে যায়, সুযোগ দেখলে সূর্য উত্তর দিকে উঠবে ভেবে উত্তর দিকে দৌঁড়ায়। এসব নিয়ে মানুষের কাছে অনেক ব্যাখ্যা আছে। আমি সেদিকে যাচ্ছি না।’

তিনি মনে করেন বাংলাদেশের রাজনীতিক দলগুলোর উচিত রাজনীতিবিদদের প্রাধান্য দেয়া। তাহলে জনগণ ও সংগঠনের জন্য উপকার।

চট্টগ্রামের রাজনীতিতে ডা. আফছারুল আমীন স্পটভাষী, সজ্জন হিসেবে পরিচিত। তাঁর নেই কোনো নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। বড় কোনো দুর্নামও নেই। এসবকে পুঁজি করে নির্বাচনি বৈতরণী পার হবার চেষ্টা করবেন নাকি বাড়তি কৌশলে এগোবেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘গুটিকয়েক পেশিশক্তির মানুষ নিয়ে রাজনীতি করা রাজনীতির সংজ্ঞায় পড়ে না। রাজনীতি মানুষের জন্য। আবার মানুষ দিয়ে মানুষকে কষ্ট দেয়া এটাতো হয় না। মানুষকে পিটিয়ে কষ্ট দেয়া এটা খারাপ। আমরা রাজনীতিই করি। সে হিসেবে বলা যায় রাজনৈতিক কৌশল থাকবে। এটা তো নির্বাচন।’

নির্মোহ, নির্লোভ, সজ্জন হওয়ায় তাঁর যেমন খ্যাতি আছে, আবার তাকে নিয়ে অভিযোগও রয়েছে নির্বাচনী এলাকার মানুষের। নির্বাচিত হবার পর এলাকার মানুষকে আশানুরূপ সময় দেননি বলে অভিযোগ কারো কারো। তবে এসব অভিযোগ থাকতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।

ডা. আফছারুল আমীন বলেন, ‘আমি জানি, রাজনীতির বাইরে যারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তাদের সাথে দেখা করা কষ্টকর হয়। কিন্তু, যারা রাজনীতি করেন তাদের সাথে দেখা করতে কষ্ট হয় এটা মনে করি না। আমি গত ১০টি বছর আমার নির্বাচনী এলাকা ঘুরেছি। স্বশরীরে হয়তো আমাকে পায়নি। কিন্তু মাধ্যম তো ছিল। শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশের মোবাইলে কথা বলার সুযোগ ছিল।’

‘ঢাকায় সপ্তাহে ৫ দিন। সপ্তাহে দুই দিন এমন কোনো শুক্রবার-শনিবার নেই, আমার নিজের বাড়িতে থাকি্নি। কাজেই কেউ যদি বলে থাকে আমার দেখা পায় নাই, এরকম আগ্রহ থাকলে আমার দুটো ঠিকানাই যথেষ্ট। মনে হয় না কেউ অভিযোগের সুরে বলছে, কারণ আমি ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন মসজিদে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে গিয়েছি।’

সংসদ সদস্যের পাশাপাশি ডা. আফছারুল আমীন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। তবে পাঁচ বছরে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। এক্ষেত্রে তিনি স্বশরীরে উপস্থিত না থাকতে পারলেও সম্পৃক্ত ছিলেন বলে দাবি করেন। অনুপস্থিতি থাকার কারণ হিসেবে দেখান, সংসদ অধিবেশন ও সংসদীয় কমিটির সভাকে। তিনি জানান, ‘সংসদে থাকতাম। ৬০ দিনের মধ্যে সংসদ ডাকা হত। তার মধ্যে যে সময়টুকু ছিল, তাতে সংসদীয় কমিটির দায়িত্ব পালন করতে হতো। সব কিছু মিলিয়ে ৬০ দিন অন্তর অন্তর উপস্থিত থাকা সময়েরও প্রয়োজন ছিল। মানুষ তো প্রতিনিয়িত জার্নি করতে পারে না। প্রতিনিয়ত এ সমস্ত ব্যস্ততার কারণেই মহানগর আওয়ামী লীগে আমার উপস্থিতি কম-এটিই সবার নজরে এসেছে।

একুশে/আরএইচ/এটি

ছবি : আকমাল হোসেন