১৩ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাচ্ছে চলচিত্র ‘শাটল ট্রেন’

ইফতেখার সৈকত : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ঐতিহ্যবাহী শাটল ট্রেন নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন নির্মাতা প্রদীপ ঘোষ। শাটল ট্রেন নিয়ে গান, কবিতা, টেলিফিল্ম, নাটক তৈরি হলেও এতদিন কোন চলচিত্র নির্মিত হয়নি। প্রথমভারের মতো তৈরি হওয়া ‘শাটল ট্রেন’ চলচ্চিত্র ২০১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।

সাতটি মৌলিক গান নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের চিত্রধারণের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে সর্বপ্রথম চলচ্চিত্রটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাস্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৭ দিনের প্রদর্শনীর ব্যাবস্থা করা হবে। পরে দেশের স্বনামধন্য প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে। এছাড়া চলচ্চিত্রটি দেশের বিভিন্ন সিনপ্লেক্সে প্রদর্শন হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার হাসি, রসাত্বক ও প্রেমময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গল্পগুলো নিয়ে গণ অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে চলচিত্রটি। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬তম ব্যাচের ছাত্রী মোহসেনা ঝর্ণার ‘বহে সমান্তরাল’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত।

চলচিত্রের পরিচালনা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ৩৪তম ব্যাচের সাবেক ছাত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রদীপ ঘোষ এবং প্রধান সহকারি পরিচালক হিসেবে আছেন নির্মাতা রিফাত মুস্তফা । এতে অভিনয় করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা।

চলচিত্রটিতে একটি রাজনৈতিক চরিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। যে চরিত্র রাজনৈতিক মতাদর্শে কাজ করছে। তার বিপরীতে নারী চরিত্রের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠলে নায়কের ভেতর একটা কমিটমেন্ট কাজ করবে। সেখান থেকে সে শিক্ষার্থীদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলো নিয়ে কাজ করবে। দুইটি ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রেমের গল্প, তাদের ভেতর ছোট ছোট জটলা ও বাস্তবতার কিছু চিত্র ফুঁটিয়ে তোলা হয়েছে চলচ্চিত্রটিতে।

দেশের সর্ববৃহৎ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যানিকেতন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর হাটহাজারীতে ১৭৫৩ একর পাহাড়ি এবং সমতল ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে যার আয়তন ২১০০ একর।

এ বিদ্যাপীঠ যেন প্রকৃতি আর মানব প্রাণের মেলবন্ধন। সবুজ বৃক্ষসারির উপর উড়ন্ত বিচিত্র রঙের হরেক রকম পাখি, সবুজ পাহাড়ের কোলে থাকা হরিণ, অজগর কিংবা বিচিত্র আর দুর্লভ প্রাণীর জীবন্ত জাদুঘর চবি ক্যাম্পাস। এখানে আছে ঝুলন্ত সেতু, ঝর্ণাধারা, উদ্ভিদ উদ্যান, শহীদ মিনার, সু-সজ্জিত লাইব্রেরি, পরিত্যাক্ত অডিটরিয়াম, জাদুঘর, রহস্যময় চালন্দা গিরিপথ কিংবা সু-বিশাল মাঠ কী নেই চবি ক্যাম্পাসে! এসবের মায়াবী সৌন্দর্য উপভোগ করতে কার মন চায় না। এই সবকিছু সৌন্দর্যের অন্যতম প্রাণ হলো শাটল ট্রেন।

প্রতিষ্ঠার গৌরবময় ৫২ বছর পাড়ি দিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় যাতায়াতের কোনো সু-ব্যবস্থা না থাকলেও ১৪ বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হয় শাটল ট্রেন। অনেক স্বপ্ন নিয়ে যার চলাচল স্বপ্নের ক্যাম্পাসে। সেই শুরু থেকে ক্লান্তিহীনভাবে চলছে এই শাটল। প্রত্যাহ বহন করছে হাজার হাজার জ্ঞানপিপাসু। শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার পাহাড় আর অরণ্যে ঘেরা এই সবুজ ক্যাম্পাসে বুকে শাটলের ঝিকঝিক ধ্বনি যেন এক মধুর বীণা।

এই শাটল নিয়ে আছে মধুময় আবেগ আর প্রাণবন্ত ভাবনা।প্রত্যাহ যেখানে চলে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনাগুলোর গল্প।মিটমাট হয় জগড়া আর অভিমান।আবার মজার সব গানেও মুখরিত এই শাটল। যেমন ‘ল ফ্যাকাল্টির মেয়েদের বিয়া করিস না আইনের প্যাচে ফালাই দিব বাঁচতে পারবি না….’ ; ‘তুমি থাক লেডিস হলে আমি থাকি শাহ জালালে’; ‘বকুল ফুল, বকুল ফুল’ ইত্যাদি।আর এসব গান গাইতে গাইতে শিল্পী হয়ে উঠেছেন অনেকেই। তাঁদের মধ্যে আজ দেশের অন্যতম তারকাশিল্পীরা হলেন নকীব খান, পার্থ বড়ুয়া, এসআই টুটুলসহ আরো অনেকেই।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণভোমরা খ্যাত এই শাটল ট্রেনের বগিগুলোর রয়েছে বিচিত্র সব নাম। যেমন : বিজয়, সিক্সটি নাইন, উল্কা, সিএফসি, একাকার, ভিএক্স, এপিটাফ, সাম্পান, কনকর্ড-ইউরেকা, খাইট্টা খা, ককপিট, ফাইটক্লাব, মহাপাপী, অলওয়েজ, বিএম ইত্যাদি

শাটল ট্রেন প্রতিদিন সকাল-বিকেল হাজার হাজার ফুটন্ত ফুলগুলো বহন করে নিয়ে আসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে। আবার রাত অবধি তাদের নিজ নিজ স্থানে পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত ক্ষান্ত নেই তার।

মহাজ্ঞানী, মহাজনের পদচারণ তার অঙ্গনে। আর তার উপর ভরসা করে হাজার হাজার জ্ঞানপিপাসুরা পার করে দিচ্ছে দিনের পর দিন। এত উপকারের পরও এই শাটলের গায়ে ডোল বাজাতে রুখে নেই এই মহাজ্ঞানীরা। প্রত্যাহ শাটলের গায়ে হাত চাপটিয়ে সৃষ্টি করছে সুরের মূর্ছনা। শাটল সিঙ্গারদের সুরের মূর্ছনায় মুখরিত থাকে শাটল ট্রেন। প্রত্যেকটা বগিতে থাকে আলাদা আলাদা গায়ক ও বাদক দল।

আবার কেউ বা কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে অন্য জগতে হারিয়ে যায়। কেউ বা মুখ খুলে ঘুমের অতল গর্ভে বিলীন।

প্রেমিক-প্রেমিকাদের কথা না বললেই নয়। শাটল ট্রেন হচ্ছে প্রেমিক যুগলদের জন্য নিরাপদ ও অবাধ জায়গা। প্রেমিক-প্রেমিকাদের ক্লাস মিস হলেও শাটল ডেট কখনো মিস হওয়ার নয়। আগেভাগে এসে সিট দখল করে রাখা এবং প্রিয়মুখের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকা যেন এক মধুর প্রতিযোগীতা

পাহাড়ি ও গ্রাম্য আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে হেলেদুলে চলতে থাকা শাটল ট্রেনের দুলুনি এবং শাটল সিঙ্গারদের সুরমূর্ছনায় প্রেমিকযুগলদের পার হয় এক অসাধারণ রোমান্টিক মুহূর্ত। কখনাে কখনাে শরতের কাঁশফুল ঘিরে রাখে শাটলের দু’পাশ। চলন্ত শাটল থেকে কাঁশফুলের স্পর্ষ এক অন্যরকম অনুভুতি।

এত ভিড়ের মধ্যেও কিছু মানুষ ব্যতিক্রম। যাদের কাছে বই একমাত্র সম্বল। কী কোলাহল, কী গ্রীষ্মের তাপদহন আবার কী শরতের কাঁশফুল? এতসব কোলাহলের ভিতরেও যথারীতি গভীর মনোযোগের সাথে বইয়ের পাতায় ডুবে যায়। তাদের সব ব্যাস্ততা বইয়ের প্রত্যেকটা শব্দের আগাগোড়া খুঁজে বের করবার কাজে।

আরেকটি দল আছে যারা মুক্ত বাতাস পছন্দ করে তাই তো তারা ঝুঁকি নিয়ে উঠে পড়ে শাটলের ছাঁদে। আর সেখান থেকে লুপে নেয় প্রকৃতির সব সুখ আর রাশি রাশি প্রেমের কণা।

শাটলের এসব রঙ্গময় ঘটনার ভেতরের আরো কিছু গল্প, সম্পর্ক, গানের দৃশ্যকাব্যে মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি ‘শাটল ট্রেন’। শাটল ট্রেনের গল্পের সাথে থাকবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য্য ও রূপ বৈচিত্র্য উঠে আসবে কিছু বাস্তব চিত্র। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন আকার ধারণ করে, চলচ্চিত্রে এই সৌন্দর্য তুলে ধরতে চলচ্চিত্রটির শুটিং সব ঋতুতে করা হয়েছে বলে জানা যায়।
চলচ্চিত্রটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতুহল বিরাজ করছে।

একুশে পত্রিকার প্রতিবেদককে শিক্ষার্থীরা জানায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্পগুলো বাস্তবেই খুব রোমান্সকর এবং এর ক্যাম্পাস প্রেমের সাগর। আর শাটল ট্রেন শিক্ষার্থীদের প্রাণের স্পন্দন। তারা আরও বলেন,বিশ্ববিদ্যালয় ও শাটল ট্রেন নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটিতে নির্মাতা আশা করি সুন্দরভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রা ফুটিয়ে তুলেছেন। আর এই চলচ্চিত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গর্ব ও সম্পদ বলেও দাবি করেন শিক্ষার্থীরা।

এদিকে চলচ্চিত্রের নির্মাতা প্রদীপ ঘোষ একুশে পত্রিকার প্রতিবেদককে বলেন, চলচ্চিত্রটির কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারীতে চলচিত্রটি মুক্তির পাবে।

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য, এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সামগ্রীক বিষয়বস্তু দেশ তথা দেশের বাইরের সকলকে জানান দিতেই আমরা এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছি।

‘শাটল ট্রেন’ চলচ্চিত্রের বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের সভাপতি অসীম দাশ একুশে পত্রিকার প্রতিবেদককে বলেন, শাটল ট্রেন আমাদের একটি আবেগের জায়গা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের শিক্ষাজীবনের হাজারো স্মৃতি। প্রদীপ ঘোষের এই কাজটির মাধ্যমে আমরা আবার পিরে পাবো আমাদের সেই পুরানো দিনগুলি।

তিনি আরও বলেন, আশা করি চলচ্চিত্রটি সকলের হৃদয়গ্রাহী হবে এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে।

একুশে/আইসি/এসসি