চট্টগ্রাম: অ্যামোনিয়া ট্যাংকের দুর্ঘটনার সময় ট্যাংকটির নিরাপত্তার জন্য থাকা পাঁচ ধরনের সুরক্ষা যন্ত্রের সবগুলোই অকেজো ছিল। এই দুর্ঘটনাকে অবহেলাজনিত উল্লেখ করে এরজন্য দুই কর্মকর্তাকে দায়ী করে তাদের শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে। বুধবার দুপুরে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সামনে এ তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন।
তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুর রশিদ। অপর দুই সদস্য হলেন- অনোয়ারার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গৌতম বাড়ৈ ও কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্ঘটনার সময় ট্যাংকটির নিরাপত্তার জন্য থাকা পাঁচ ধরনের সুরক্ষা যন্ত্রের সবগুলোই অকেজো ছিল। এর মধ্যে ট্যাংকের তাপমাত্রা কমানোর জন্য কুলিং/রেফ্রিজারেশন কম্প্রেসার সিস্টেম ৩ বছরের বেশি সময় ধরে নষ্ট ছিল। ট্যাংকে রক্ষিত গ্যাসের চাপ মাপার জন্য দুটি প্রেসার গজ রয়েছে যা, দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট ছিল। ট্যাংকের তাপ ও চাপ মাপার জন্য স্বয়ংক্রিয় ডি সি এস সিস্টেম রয়েছে। এই সিস্টেমে দুটি প্রেসার ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে ট্যাংকের গ্যাসের চাপ দুটি কম্পিউটারে প্রদর্শিত হয়। যার একটি দীর্ঘদিন ধরেই নষ্ট এবং অপরটি দুর্ঘটনার আগেরদিন নষ্ট হয়ে যায়। ট্যাংকে রক্ষিত অতিরিক্ত গ্যাসের চাপ বের করে দেওয়ার জন্য দুটি প্রেসার ভেন্ট রয়েছে। দুর্ঘটনার সময় এ দুটিও বন্ধ ছিল। এছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্যাসের চাপ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ট্যাংকে একটি ফ্লেয়ার সিস্টেম রয়েছে। দুর্ঘটনার সময় এটিও অকেজো ছিল।
দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, দুর্ঘটনার সময় ৫০০ মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্যাংকটিতে ৩৪০ মেট্রিক টন তরল অ্যামোনিয়া ছিল। একদিকে ট্যাংকের সকল নিরাপত্তা যন্ত্রপাতি নষ্ট ও বন্ধ থাকা, অপরদিকে মাত্রাতিরিক্ত গাসের চাপ, ফলে ট্যাংকটির নিচের অংশে বেজপ্লেট বরাবর বিস্ফোরণ ঘটে। নির্গত গ্যাসের চাপে ট্যাংকটি উড়ে গিয়ে প্রায় ২০ ফুট দুরে পড়ে এবং সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্যাংকের নিরাপত্তার জন্য থাকা পাঁচ ধরনের সুরক্ষা যন্ত্রের সবগুলোই অকেজো থাকার বিষয়টি মেইনটিনেন্স বিভাগকে জানানোর পরও তারা যথাযথ উদ্যোগ গ্রহন করেনি।
বিশেষত: উপ-প্রধান প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) দিলীপ কুমার বড়–য়া এবং জিএম নকিবুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে যে জবানবন্দি দিয়েছেন তা রীতিমত তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব অস্বীকার করার সামিল। এই দুই কর্মকর্তা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে এই দূঘর্টনা থেকে রক্ষা পাওয়া যেত। সাক্ষ্য, প্রমাণ, লিখিত জবানবন্দি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যালোচনায় তদন্ত কমিটি মনে করে, এই দুই কর্মকর্তা এই দূর্ঘটনার জন্য দায়ী। তারা সেফটি সিস্টেম মেরামতের বিষয়টি তদারকি করেননি। এবং নিজেরা মেরামতের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। এই দুই কর্মকর্তা স্বপদে বহাল থাকলে এই প্ল্যান্টটি কারো জন্য নিরাপদ নয়। তদন্ত কমিটি তাদের প্রত্যাহার পূর্বক বিভাগীয় শাস্তি ও তাদের আনুতোষিক হতে ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুপারিশ করছে।
তদন্ত কমিটির অন্য সুপারিশগুলো হলো- ড্যাপের ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও আন্ত:বিভাগীয় সমন্বয় সাধন, তাদের সকল কাজকর্মে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা নিশ্চিত করা, ড্যাপের দৈনন্দিন কার্য পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ক্রয়, মেরামত ও অন্যান্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা ব্যবস্থাপকের উপর ন্যস্ত করা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে একটি শক্তিশালী চেইন-অব-কমান্ড প্রতিষ্ঠা করা, ড্যাপ-১ ও ড্যাপ -২ ফ্যাক্টরি দুটিতে নিজস্ব ফায়ার ফাইটিং এবং সেফটি ইউনিট রাখা।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, এই তদন্ত প্রতিবেদন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় বরাবরে পাঠানো হবে। প্রতিবেদনের আলোকে মন্ত্রনালয় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করবে।
প্রসঙ্গত গত ২২ আগস্ট রাত ১০টায় আনোয়ারার ডাই অ্যামেনিয়া ফসফেট (ডিএপি) সার কারখানার গ্যাস ট্যাংক বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর চারপাশে অ্যামোনিয়া গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এতে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। অ্যামোনিয়া গ্যাসের তীব্রতায় আশপাশের জলাশয়গুলোর বিভিন্ন প্রজাতির ৩৬ মেট্রিক মাছ ও চিংড়ি মারা গেছে বলে আনোয়ারা উপজেলা মৎস্য অফিসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
