কয়েক মাসেই ‘কোটিপতি’ হওয়ার প্রলোভনে ফের মাঠে ‘এমএলএম’

screenshot_34-copyমামুনুল হক চৌধুরী: বিনিয়োগ উঠে আসবে মাত্র ৫ মাসে! পরের ২৫ মাসে বিনিয়োগের আড়াই গুণ লাভ। সোজা কথায় এক ডলার বিনিয়োগে ৩০ মাসে পাওয়া যাবে সাড়ে ৩ ডলার। এছাড়াও আছে ‘ম্যাচিং’ বোনাস, ‘র‌্যাংকিং’ ইনসেন্টিভ, আজীবন ঘরে বসে মুনাফা পাওয়ার হরেক রকমের লোভনীয় মুনাফার প্রলোভন। এভাবে শত ভাগ মানি ব্যাক গ্যারেন্টি দিয়ে চট্টগ্রামসহ দেশে ফের একাধিক এমএলএম কোম্পানী অর্থ লুটের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

এর মধ্যে ‘বিট মানি গ্লোবাল ডট নেট’ (www.bitmoneyglobal.net) ৫ মাসে দিগুণ, ‘এমবিসি-ওয়ার্ল্ড ডট কম’ (www.mbc-world.com) ২৪ মাসে ৪ গুণ, কিক-প্রফিট ডট কম (www.kick-profite.com) ৩ মাসে দিগুণ, ইলগেমস ডট কম (www.ilgamos.com) ৬ মাসে দিগুণ, ‘ইউএসএ-মানিবিডডটকম’ (www.usamoneybid.com) ৩০ মাসে দিচ্ছে আড়াই গুণ মুনাফা।

এই সব সাইটের কয়েকজন বিনিয়োগকারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিষিদ্ধ জেনেও ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে কয়েক লাখ মানুষ বিনোয়াগ করেছেন কোটি কোটি টাকা। বিকাশ, ব্যাংক, পেপাল, লিভার্টি রিজার্বের মাধ্যমে টাকাও পাচ্ছেন তারা।

ইউনিপে-টু-ইউ, ডেসটিনি, স্পিক এশিয়া, টিভিআই এক্সপ্রেস, টিভিআই এক্সপ্রেস ডট বিজ নামের কথিত এমএলএম প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারকরাই এসব সাইট ব্যবহার করে নতুন ফাঁদ নিয়ে বসেছে। প্রশাসনের চোঁখে ধুলো দিয়ে নানা প্রলোভন দিয়ে কৌশলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এসব প্রতারক চক্র।

একে অপরকে নিরবে টাকা কামানোর পরামর্শ দিয়ে সংবাদ মাধ্যম থেকে দূরে থাকার পরামর্শও দিচ্ছে তারা। যেন কোনভাবেই ইউনিপে-টু-ইউ, ডেসটিনি ও স্পিক এশিয়ার মত নেতিবাচক কোন সংবাদ প্রকাশ না পায়- সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দেয় প্রতারকরা।

screenshot_35-copyসাতকানিয়া উপজেলার কেরানীহাটের বাসিন্দা নগরীর একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কামাল উদ্দিন। গত ৫ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁও থানাধীন বহদ্দারহাটের হোটেল জামানে এই প্রতিবেদককে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানান তিনি। সেসময় ‘ইউএসএ মানি বিড ডটকম’ নামের এলএলএম কোম্পানীতে বিনিয়োগ করে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখানো হয় এই প্রতিবেদককে।

একটি জাতীয়তা সনদ অথবা পাসপোর্ট, একটি ই-মেইল এড্রেস, একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে বিনিয়োগ করার জন্য ফ্রিতে একটি আইডি সহজেই খোলার জন্য প্রতিবেদককে পরামর্শ দেন কামাল।

এই প্রতিবেদককে প্রলুব্ধ করার অংশ হিসেবে, কামাল বলেন, ইতিমধ্যে বিভিন্নজন আইডি কার্ড দিয়ে ১৭টি আইডি খুলে মাত্র দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতি মাসে লাখ টাকা উপার্জন করছেন। এছাড়াও উপার্জিত অর্থে ইতিমধ্যে কক্সবাজারে ফ্ল্যাটসহ অনেক নগদ অর্থের মালিক হয়েছেন।

প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ইউএসএ মানি বিড ডটকম- ১৯৮৫ সাল থেকে ব্যবসা করছে। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি এই ব্যবসাটি বাংলাদেশে আনেন। তার পরামর্শে ১৩ জানুয়ারি থেকে এই ব্যবসা শুরু করেন কামাল। ইতিমধ্যে তার অধীনে কয়েকশ বিনিয়োগকারী কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।

কামালের মতে, ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ যুক্ত হয়েছে এই ব্যবসায়। চট্টগ্রামে প্রায় ৫ হাজার বিনিয়োগকারী রয়েছে।

এক পর্যায়ে অনুমোদনবিহীন ও নিষিদ্ধ জেনেও দ্রুত অর্থ উপার্জনের জন্য সিরাজুল ইসলামের পরামর্শে এই ব্যবসাটি বেছে নিয়েছেন বলে এই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেন কামাল; এর আগেও দুইজন একসাথে ডেসটিনি, ইউনিপে টু ইউ-তে কাজ করেছেন বলে জানান তিনি।

রাউজানের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম ইতিপূর্বে নিষিদ্ধ হওয়া ডেসটিনি, ইউনিপে টু ইউ এর ট্রেইনার পর্যায়ের বিনিয়োগকারী ছিলেন জানিয়ে কামাল এই প্রতিবেদককে জানান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, কুমিল্লা, ঢাকাসহ দেশের একাধিক জেলায় অফিস নিয়ে ‘ইউএসএ-মানি বিড ডট কম’ এ বিনিয়োগ করার জন্য নিয়মিত সভা সেমিনার করছেন তিনি।

screenshot_36-copyপরে এই প্রতিবেদক সিরাজুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করে ‘ইউএসএ-মানি বিড ডট কম’ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যবসাটি এমএলএম নয়; তবে এমএলএম ও ফরেক্স ট্রেডিংয়ের মতো ইন্টারন্যাশনাল শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করার মতো একটি সাইট। যে কেউ চাইলে ফ্রিতে একটি একাউন্ট খুলে বিনিয়োগ করতে পারে। তবে যেহেতু মানুষকে জয়েন্ট করাতে পারলে কোম্পানীটি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশের একটি অংশ দেয় তাই সভা সেমিনার করে মানুষকে উদ্ভুদ্ধ করছি।’

ফরেক্স ট্রেডিং ও এমএলএম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জানিয়ে অনুমোদন বিহীন এ ধরণের একটি কোম্পানীতে বিনিয়োগ করার জন্য মানুষকে প্রলুব্ধ করা বে-আইনী কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফরেক্স ট্রেডিং ও এমএলএম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হলেও সবাই করছে। এটিও নিষিদ্ধ, তবে সেভাবে নিষিদ্ধ নয়।’

এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘শুধু ইউএসএ মানি বিড ডটকম নয়; বাংলাদেশে এ ধরণের অনেক সাইট ব্যবসা করছে।’ এরপর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

পরে বাংলাদেশে এই ধরনের ব্যবসা করছে এমন বেশ কয়েকটি সাইটের নাম ও তাদের মুনাফার হার উল্লেখ করে ০১৮১১ ০১২০০১ নম্বর থেকে এই প্রতিবেদকের মোবাইলে একটি এসএমএস দেন। পরে ওই নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ফোন রিসিভ করেননি কেউ।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য্য একুশেপত্রিকা ডটকমকে বলেন, ‘এ ধরণের ব্যবসার সাথে জড়িতদের ব্যাপারে প্রমাণসহ কোন ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’

‘এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য গোয়েন্দা শাখাকে নির্দেশনা দেওয়া হবে। তথ্যের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে নগর পুলিশ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ -যোগ করেন দেবদাস ভট্টাচার্য্য।