চট্টগ্রাম কারাগারে মাদক ব্যবসার মূলে হামকা নুর আলম!

ctg jailশরীফুল রুকন : চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে টাকা দিলেই মিলছে মাদকদ্রব্য! কারাগারের ভেতরে ইয়াবা ও গাঁজা খুবই সহজলভ্য! বন্দিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদক আইনের আসামি থাকায় ব্যবসাও হচ্ছে জমজমাট।

অভিযোগ রয়েছে, এ ব্যবসার মূলে রয়েছেন নুরুল আলম ওরফে হামকা নুর আলম নামের এক ব্যক্তি। কারাবন্দি এই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে কমপক্ষে ১৪টি মামলার খোঁজ মিলেছে। এর মধ্যে ৫টি অস্ত্র মামলা। তাকে মাদকব্যবসায় সহযোগিতা করে কারাগারের কিছু অসৎ ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, ২০১১ সালের ২০ মে চট্টগ্রাম নগরীর রুবি গেট এলাকা থেকে দুটি অস্ত্র ও গুলিসহ দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘হামকা বাহিনী’র প্রধান নুরুল আলম ওরফে হামকা নুর আলমকে (৩৫) গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর জামিনে মুক্তির পর ২০১৩ সালের ১ নভেম্বর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। দীর্ঘ এই সময়ে বন্দি থেকে কারাগার কেন্দ্রীক মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন নুরুল আলম ওরফে হামকা নুর আলম।

অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সাঙ্গু ভবনের ৫ম তলার ১৬ ও ১৭ নং ওয়ার্ড পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে সেখানে মাদক ব্যবসা করছেন হামকা নুর আলম। ভোর ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত সময়ে অন্য ওয়ার্ডগুলোর মাদকসেবীরা সাঙ্গু ভবনের ওই দুটি ওয়ার্ডে ভিড় জমান। সাঙ্গু ভবনের ওই ওয়ার্ডের বাইরে দায়িত্বরত কারারক্ষিকে ৫০ টাকা দিলে কারাগারের অন্য ওয়ার্ডের বাসিন্দারা প্রবেশ করতে পারেন। এরপর ওয়ার্ডে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট টাকা দিলেই মিলে ইয়াবা ও গাঁজা।

কারাগার থেকে সম্প্রতি মুক্ত হয়েছেন এমন একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, সেখানে দুই ধরনের ইয়াবা পাওয়া যায়। বড় সাইজের ইয়াবা যেটা আরসেভেন নামে পরিচিত, সেটা প্রতি পিস ৩০০ টাকা। ছোট সাইজের ইয়াবা, যেটা পরিচিত সিটি নামে; সেটা প্রতি পিস ১০০ টাকা। গাঁজার পুটলির সাইজ অনুযায়ীও দামে ভিন্নতা আছে। ৫০ ও ১০০ টাকায় গাঁজার পুটলি পাওয়া যায়। এছাড়া বড় সাইজের পুটলি, যেটা বস্তা নামে পরিচিত; সেটার দাম রাখা হয় ২৫০ টাকা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাইরে থেকে কারাগারে মাদক সরবরাহের মূল কাজটা করেন নগরীর শীর্ষ সন্ত্রাসী গোলাম সরওয়ার মিলন ও হামকা নুর আলমের মা। এমনকি কারাগার থেকে আদালত ভবনে হাজিরা দিতে গিয়ে মাদক নিয়ে আসেন হামকা নুর আলম। কারাগারের গেটে কোনোরকমের তল্লাশি ছাড়ায় মাদক নিয়ে তিনি প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ আছে। এছাড়া কারাগারের ভেতর হামকা নুর আলমের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করেন জাকির নামের এক বন্দি।

সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে জানিয়েছেন, গত ১৬ আগস্ট বিকেল ৪টার দিকে আদালত থেকে ফেরার পর কারাগারে প্রবেশের সময় ৪০০ ইয়াবা ও ৩ কেজি গাঁজাসহ ধরা পড়েন হামকা নুর আলম ও বাছা ওরফে বাছাইয়্যা। কারাগার কর্তৃপক্ষকে ‘না জানিয়ে’ মাদক নিয়ে আসায় তা আটক করে ফেলা হয়।

এদিকে অভিযোগ প্রসঙ্গে জানার জন্য গত ৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। এতে বিফল হলে ডেপুটি জেলার জাহেদুল আলমের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ডেপুটি জেলার আমিরুল ইসলাম ও সিনিয়র জেল সুপার সাংবাদিকদের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ রাখবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। আপনি ওনাদের সাথে যোগাযোগ করুন।’ এরপর ডেপুটি জেলার আমিরুল ইসলামের মুঠোফোনে ফোন করা হলে- তা বন্ধ পাওয়া গেছে।

তবে গত ৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টার দিকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবিরের মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তার সাথে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করেন এই প্রতিবেদক। কিন্তু ব্যস্ততা দেখিয়ে দেখা করার কারণ জানতে চাইলেন তিনি। এরপর কারাগারে মাদক ব্যবসার অভিযোগ সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘আদালত থেকে কারাগারে আসার সময় কেউ কেউ পেটের ভেতর করে মাদক নিয়ে আসছেন। আরও কতভাবে যে মাদক নিয়ে আসছেন। এভাবে বিভিন্ন সময়ে ধরা পড়ার পর বিধি অনুযায়ী তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। তবে কারাগারে মাদক নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগটি সঠিক নয়।’

মাদক ব্যবসায়ী হামকা নুর আলমকে কোন সময় শাস্তি দেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেককে শাস্তি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে নুর আলম নামের কেউ আছে কিনা আমি জানি না। এখন রাখুন- আমি ব্যস্ত আছি!’

*** চট্টগ্রাম কারাগারে চলছে বন্দি বেচা-কেনার ‘নিষ্ঠুর’ বাণিজ্য!
*** ‘জামিনআদেশ’ ঘিরে চট্টগ্রাম কারাগারে প্রকাশ্যে ঘুষবাণিজ্য
*** চট্টগ্রাম কারাগারের ভেতর থেকে দুটি মোবাইল উদ্ধার
*** জেলগেটে ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধারের খবর