
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে ওয়ান ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের দুটি শাখায় খাদিজাতুল আনোয়ার সনি ও তার পরিবারের খেলাপি ঋণ ২২ কোটি টাকা। ব্যাংক ও আদালত সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। এরপরও তাকে সংরক্ষিত নারী আসনে বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী এখন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও কয়েকটি বিশেষায়িত ব্যাংকের ঋণ খেলাপিরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। তবে খেলাপি ঋণ পরিশোধ বা নবায়ন করলে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। এক্ষেত্রে সনি খেলাপি ঋণ নিয়মিত করেননি, ব্যাংকের ধারেকাছেও যাননি।
এদিকে ঋণকে খেলাপি হিসেবে না দেখাতে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নেয়ার প্রবণতা একাদশ সংসদ নির্বাচনে বেশ কিছু প্রার্থীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে। তবে খাদিজাতুল আনোয়ার সনি তার বিরুদ্ধে থাকা খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত দুটি মামলায় উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়ে স্থগিতাদেশ আনেননি বলে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতের সেরেস্তা শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে ফটিকছড়ির বাসিন্দা মোরশেদ হাজারী পরিচয়ে গতকাল বুধবার বিকেল ৪টা ৩৯ মিনিটে বিভিন্ন গণমাধ্যমের ইমেইল ঠিকানায় কিছু তথ্য-উপাত্ত পাঠানো হয়। ‘সংরক্ষিত মহিলা আসনে ঋণ খেলাপি গ্রেফতারী পরোয়ানাভুক্ত আসামীকে মনোনয়ন দেওয়ায় সংবাদ প্রকাশের আবেদন প্রসঙ্গে।’ শিরোনামের ওই ইমেইল বার্তায় মামলার বেশকিছু নথিপত্রও সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
এতে উল্লেখ করা হয়, খাদিজাতুল আনোয়ার সনি ও তার স্বামী এস এম পারভেজ আলম এবং শাশুড়ি আয়েশা বেগমের কাছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার পাওনা ৬ কোটি ৫৩ লাখ ২০ হাজার ৫৭৭ টাকা; যার পুরোটা খেলাপি। এ ঘটনায় ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর সনির বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
ওয়ান ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ১৫ কোটি ৫৭ লাখ ৪৪ হাজার ৮৯১ টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ায় খাদিজাতুল আনোয়ার সনি ও স্বামী এস এম পারভেজ আলমসহ আরো চারজনের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে মামলা হয়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় যাচাই করে এসব তথ্যের সত্যতা পেয়েছে একুশে পত্রিকা।
এ বিষয়ে ওয়ান ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. রাশেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, তিনি (খাদিজাতুল আনোয়ার সনি) আমাদের ব্যাংকের ঋণখেলাপি ছিলেন। আদালত থেকে ঋণের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়েছেন এতটুকু আমি জানি। বিস্তারিত জানি না।
তবে স্থগিতাদেশ সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যাংক কর্মকর্তার বক্তব্যের সত্যতা আদালতে খোঁজ নিয়ে মেলেনি; সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর ওয়ান ব্যাংকের মামলাটির বিষয়ে আদালতের আদেশে স্থগিতাদেশ বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই। ডিক্রি জারী পরোয়ানা ফেরত আসেনি বলেও এতে উল্লেখ করা হয়। গত ১০ ফেব্রুয়ারি ইস্যু করা উক্ত মামলার আদেশের অনুলিপি একুশে পত্রিকার হাতে আছে, যাতে স্থগিতাদেশের বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই।
অন্যদিকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহিদ হাসানের সাথে যোগাযোগ করে ঋণখেলাপির প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন একুশে পত্রিকার প্রতিবেদক; এরপর তিনি বলেন, সব জেনেই তো আমার সাথে যোগাযোগ করেছেন। আমি এখন ‘ভিজিটে’ আছি। তাই এ নিয়ে কথা বলতে পারছি না।’
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ব্যাংকগুলো বলেছে যে, নারী আসনের প্রার্থীদের কারো কাছ থেকে কোন টাকা তাদের পাওনা নেই। এ প্রেক্ষিতে প্রার্থীদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে ইতিমধ্যে।
তিনি বলেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বা প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীদের মধ্যে কেউ অভিযোগ করলে ঋণখেলাপি প্রার্থীর বিষয়ে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবো। তৃতীয় কোন পক্ষের এ বিষয়ে অভিযোগ করার সুযোগ নেই। এমনকি এ নিয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে অনুসন্ধান করার সুযোগ নির্বাচন কমিশনেরও নেই।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খাদিজাতুল আনোয়ার সনির মোবাইলে একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে চারবার কল করা হয়; রিং পড়লেও তিনি সাড়া দেননি।
একাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত ৫০টি আসনের জন্য ৪৯টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।
দলগুলোর প্রাপ্ত সাধারণ আসনের সংখ্যানুপাতে বণ্টিত নারী আসনে বিএনপির একটি আসন পাওয়ার সুযোগ থাকলেও তাদের এমপিরা এখনও শপথ না নেওয়ায় তাদের নারী আসন স্থগিত রয়েছে, তাই প্রার্থী একজন কম হয়েছেন।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী অন্য সব রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের জোটের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
অতিরিক্ত প্রার্থী না থাকায় আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা পার হওয়ার পর এই ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। এই তালিকায় চট্টগ্রাম থেকে খাদিজাতুল আনোয়ার সনিও রয়েছেন।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের সাবেক সাংসদ রফিকুল আনোয়ারের মেয়ে খাদিজাতুল আনোয়ার সনিকে দশম সংসদে চট্টগ্রাম-২ আসনে সরাসরি নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দিয়ে পরে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। নির্বাচনে ওই আসনটি মহাজোটের অংশীদার নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীকে ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। একাদশ সংসদেও উক্ত আসনে নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী নির্বাচন করেন।
এদিকে স্বামী বিএনপি নেতা হওয়ায় সমালোচনার মুখে একাদশ সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত মনোনয়ন তালিকা থেকে গত ১১ ফেব্রুয়ারি বাদ পড়েছেন যুব মহিলা লীগের সহ-সভাপতি শিরিনা নাহার লিপি। তার স্বামী আইনজীবী গাজী কামরুল ইসলাম সজল বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, যা নিয়ে আপত্তি করেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরা।
