মামুনুল হক চৌধুরী : বিচারক ও প্রশাসক হিসেবে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চট্টগ্রামের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান। দুরদর্শী ভাবনার বিচক্ষণ এই কর্মকর্তার আন্তরিকতা ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি আদালতে মামলার জট এখন নেই বললেই চলে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন- দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, অধিক সাক্ষ্য গ্রহণ, সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, নথি যথাসময়ে রেকর্ডরুমে প্রেরণ, দ্রুততম সময়ে নকল সরবরাহ, সঠিক সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আদালতে উপস্থিত থাকা, মাসিক পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসী কনফারেন্স অনুষ্ঠানসহ যাবতীয় সকল কাজে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেসির প্রধান এই বিচারিক কর্মকর্তা। আর এতে সুফল পেয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলার চিফ জুসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান। বিচারিক কাজের পাশাপাশি জেলার সকল জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটগুলোর বিচারিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে প্রশাসনিক প্রধানের ভুমিকা পালন করতে হয় চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে।
মুন্সী মশিয়ার রহমান চট্টগ্রামের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তার নেতৃত্বে জেলার ১২টি জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসী আদালতে এ পর্যন্ত অর্থাৎ গত দুই বছরে ৬৫ হাজার ৩৬৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর আগে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ছিল ৪৬ হাজার ৬০২টি।
বেড়েছে সাক্ষ্য গ্রহণের হারও। চিফ জুসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুন্সী মো. মশিয়ার রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের পর গত দুই বছরে জেলার ম্যাজিস্ট্রেসী আদালতগুলোতে সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে ৩৪ হাজার ৪১ জনের; যা সেপ্টেম্বর ২০১২ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত ছিল ১৬ হাজার ৯৮১ জন। মুন্সী মো. মশিয়ার রহমানের যোগদানের সময়ে বিচারাধীন মামলা (সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে) ছিল ২১ হাজার ৬৮৫টি। বর্তমানে (সেপ্টেম্বর ২০১৬) বিচারাধীন মামলা আছে ১৭ হাজার ৭৪৮টি।
আদালত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন- মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি নির্ভর করে আদালতে সাক্ষীদের উপস্থাপনের উপর। এই কাজে পুলিশের গাফিলতি নজরে আসায় যথাসময়ে সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিতকল্পে নানা বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন মুন্সী মোঃ মশিয়ার রহমান। এরই অংশ হিসেবে জেলার ১৮টি থানার প্রত্যেকটি পরিদর্শনে বের হন তিনি। কোনো কোনো থানায় একাধিক বার পরিদর্শন করেছেন এই বিচারক। থানায় থানায় গিয়ে সাক্ষীর সমন পর্যবেক্ষণ করেন এবং থানার অফিসার ইনচার্জগণকে সময়ের মধ্যে সাক্ষীদের হাজিরা, গ্রেফতারী ও ক্রোকী পরোয়ানা তামিলের নির্দেশ দেন। নিয়মিত পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেসী বৈঠকের ব্যবস্থা করে আলোচনা মাধ্যমে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির পথে বাধাসমূহ চিহ্নিত করেন ও তার সমাধানের পথ বের করেন।
আদালত সূত্র জানায়, মুন্সী মোঃ মশিয়ার রহমানের যোগদানের পূর্বে উক্ত আদালতে আলাদা কোনো রেকর্ড রুম ছিল না। তিনি যোগদান করে নতুন রেকর্ড রুম প্রস্তুত করেন এবং আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তিকৃত মামলাগুলোকে রেকর্ড রুমে প্রেরণের ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের রেকর্ড রুমটি অন্তত সাজানো ও পরিপাটি। রেকর্ড রুমে স্থাপন করা হয়েছে লোকেশন ম্যাপ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচক্ষণ এই বিচারকের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বর্তমানে সর্ব্বোচ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যে কোনো নকল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমেছে বহুগুণে। গত দুই বছরে মোট ফলিও নকল দেয়া হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৮২৪টি। মালখানায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে অবিন্যস্ত থাকা আলামতগুলো এখন রাখা হচ্ছে সুবিন্যস্তভাবে। এতে যুক্ত হয়েছে কম্পিউটার। নেজারত শাখা হতে যাতে প্রসেসগুলো নিয়মানুসারে জারি হয় সে বিষয়ে কঠোর নজরদারী করছেন তিনি। বর্তমানে এই শাখায় কোনো সমনজারি পেন্ডিং নেই। বিচার সংশ্লিষ্ট সকল কাজ বর্তমানে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কঠোর নজরদারীতে রয়েছে।
বর্তমানে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে চৌকি আদালতের বিচারক ও বিদ্যুৎ আদালতের বিচারকসহ মোট ১২ জন বিচারক কাজ করে যাচ্ছেন।
চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মহানগর আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, ‘দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য যতটুকু করা প্রয়োজন সততা ও নিষ্ঠার সহিত তিনি সবটুকুই করার চেষ্টা করেছেন। জেলার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অল্প সময়ে নজিরবিহীন পরিবর্তন করেছেন। বিচারক ও প্রশাসক হিসেবে তার ভূমিকা অনুকরণীয়।’
