না ফেরার দেশে ক্রিকেটার গড়ার কারিগর আলতাফ হোসেন

ঢাকা : বাংলাদেশ ক্রিকেটের কারিগর সৈয়দ আলতাফ হোসেন ইন্তেকাল করেছেন।(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।

মঙ্গলবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। তাঁর অকাল মৃত্যুতে বাংলাদেশের পুরো ক্রিকেটাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শোক জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।

কে এই আলতাফ হোসেন-

আলতাফ হোসেন ১৯৩৮ সালে হুগলিতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হারান বাবাকে, দুই ভাইকে। পরে মায়ের সঙ্গে চলে আসেন এই বাংলায়।পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাকিস্তান টেস্ট দলে ডাক পাওয়া প্রথম বাঙালি ক্রিকেটার। স্বাধীন বাংলাদেশে ক্রিকেট কোচিংয়ের অগ্রগূত, জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার প্রাপ্ত প্রথম ক্রিকেট কোচ, কিংবদন্তি ক্রিকেট ব্যাক্তিত্ব। অজস্র ক্রিকেটারের গুরু। তার হাত ধরেই এদেশে খেলাটির গোড়াপত্তন হয়।

খেলোয়াড়ি জীবনী-

খেলোয়াড়ি জীবনে ছিলেন পেসার, তবে ব্যাটিংয়ের হাতও ছিল বেশ ভালো। ১৯৫৪ সালে কায়েদে আজম ক্লাবের হয়ে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শুরু। পরে খেলেছেন ওয়ান্ডারার্স, পিডব্লিউডি, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, ইস্ট পাকিস্তান জিমখানা ও শান্তিনগর ক্লাবে।ক্রিকেটের পাশাপাশি একসময় ফুটবলেও খেলেছেন ঢাকার তৃতীয় বিভাগে, দাপটের সাথে খেলেছেন বাস্কেটবল। শেষ পর্যন্ত থিতু হন ক্রিকেটেই।

১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান দলের অন্যতম ভরসা হয়ে ছিলেন তিনি। ১৯৬৫ সালের মার্চে আসে তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের মাহেন্দ্রক্ষণ। সেই সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ডাক পান পাকিস্তান টেস্ট দলে। জায়গা পান নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে। খেলার সুযোগ যদিও পাননি, বসিয়ে রাখা হয়েছিল।

প্রথম টেস্টে পাকিস্তানের নতুন বল নিয়েছিলেন আসিফ ইকবাল ও মাজিদ খান, পরিবর্ত পেসার ছিলেন মোহাম্মদ ফারুক। অনায়াসেই সেখানে জায়গা পেতে পারতেন আলতাফ হোসেন। কিন্তু যথারীতি পূর্ব পাকিস্তানের একজন হিসেবে শিকার হয়েছিলেন বঞ্চনার। এই দু:খবোধ তার সঙ্গী ছিল আজীবন।

টুকটাক ক্রিকেট খেলে গেছেন ১৯৮২ সাল পর্যন্ত। খেলেয়াড়ি জীবনেই ১৯৭০ সালে শুরু করেন আম্পায়ারিং। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের আম্পায়ার হয়ে পরিচালনা করেছেন প্রথম শ্রেণির ম্যাচ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিযুক্ত হন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কোচ। পরে কোচ হিসেবে নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যে, তার খেলোয়াড়ী জীবনও অনেকটা আড়াল হয়ে গেছে কোচ হিসেবে সাফল্যে। যাদের হাত ধরে গড়ে উঠেছে স্বাধীন বাংলাদেশের মাঠের ক্রিকেট, তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি।

বাংলাদেশের প্রথম কোচ-

ভারতের পাতিয়ালায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্পোর্টস থেকে কোচিং কোর্স করে আসা বাংলাদেশের প্রথম কোচ তিনি। পরে কোচিং কোর্স করে এসেছেন ইংল্যান্ড থেকেও। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কোচ হিসেবে কাজ করেছেন ১৯৭৬ সাল থেকে ২০০১। আশির দশকে অনেকবারই বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯০ এশিয়া কাপেও ছিলেন বাংলাদেশ দলের ডেপুটি ম্যানেজার কাম কোচ। ‘এ’ দল ও বয়সভিত্তিক দলগুলির দায়িত্বে ছিলেন অনেকবার। তার সৌজন্যেই ক্রিকেট কোচিংয়ে নতুনত্ব আনা, ফিল্ডিংয়ে বিশেষভাবে জোর দেওয়া, বাংলাদেশের ক্রিকেট এসব দেখেছে।

বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দলের অগ্রদূত-

বাংলাদেশে মহিলা ক্রিকেট চালুর অন্যতম অগ্রদূতও আলতাফ হোসেন। ১৯৮৩ সালে ঢাকা আবাহনী দল নিয়ে গিছেন কলকাতায়। ১৯৯৭ সালে তাকেই মহিলা দল গড়ে তোলার দায়িত্ব দেয় বিসিবি। ২০০৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থেকে চেষ্টা করেছেন মহিলা ক্রিকেটের ভিত শক্ত করার।

বাংলাদেশে নারী ক্রিকেটের শুরু হয় আলতাফের হাত ধরে। ১৯৯৭ সালেই বিসিবি তারই হাতে তুলে দেন নারী ক্রিকেট দল গড়ে তোলার দায়িত্ব। অবশেষে ১৯৯৯ সালে মেলে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। ভূষিত হন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে। দেশের ক্রীড়ার সর্বোচ্চ এই স্বীকৃতি পাওয়া প্রথম ক্রিকেট কোচ ছিলেন তিনিই। ২০০৯ সালে মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার পর কোমায় চলে গিয়েছিলেন। সে যাত্রায় ফিরে এলেও নিজের শরীরের সঙ্গে লড়াই চলতেই থাকে। শেষ পর্যন্ত অমোঘ নিয়তি মেনে নিতেই হলো।

একুশে/ডেস্ক/এসসি