দক্ষিণ কোরিয়ায় ভুয়া সার্টিফিকেটে ভিসা পরিবর্তনের হিড়িক

ওমর ফারুক হিমেল : সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার আনসান এলাকায় কাউসার নামে একজনকে আটক করে কোরিয়ার ইমিগ্রেশন। এরপর কোরিয়ার ইমিগ্রেশন সার্টিফিকেট নকল করে জমা দেওয়ার অপরাধে বাঙালি কমিউনিটির এক নেতাকে গ্রেপ্তার করে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ভিসা পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট নকল করে জমা দেওয়ার অপরাধে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক E 7-4 ভিসাধারী বাংলাদেশীকে ফেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে ধরপাকড় শুরু হওয়ায় এরমধ্যেই ভুয়া সার্টিফিকেটধারী অনেকেই ইউরোপ ও বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।

নিয়মানুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মরতদের স্কিল ভিসা পরিবর্তন করতে গেলে নির্ধারিত পয়েন্ট সিস্টেমে আবেদন করতে হয়। পয়েন্ট সিস্টেমে স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রী থাকলে ২০ পয়েন্ট পাওয়া যায়।

সূত্র মতে, পয়েন্ট সিস্টেমের সুযোগ কাজে লাগাতে অনেক বাংলাদেশি ভুয়া সার্টিফিকেট জমা দিয়ে ভিসা পরিবর্তন করেছে। বিষয়টি কোরিয়ান ইমিগ্রেশনের নজরে আসার পর ভিসা পরিবর্তনকারীদের সার্টিফিকেট সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশে সংশ্লিষ্টদের নিকট পাঠানো হয়। সেখানে জালিয়াতির বিষয়টি বের হয়ে আসে। তারপর থেকে ধরপাকড় শুরু হয় এবং অনেককেই গ্রেফতার করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।

সূত্র মতে, গত তিনবছরে প্রায় তিনশ’ ইপিএসকর্মী তাদের ভিসা স্ট্যাটাস পরিবর্তন করে। এর মধ্য ৫৪ জনেরই সার্টিফিকেট ভুয়া।

জানা যায়, কিছু ইপিএসকর্মী ও কোরিয়ায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি অংশ জাল ও ভুয়া সার্টিফিকেট-মার্কশিট সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত। একাডেমিক কোনো যোগ্যতা না থাকলেও টাকার বিনিময়ে জাল শিক্ষাগত সার্টিফিকেট সংগ্রহ করছে শত শত ইপিএসকর্মী।

এসব সার্টিফিকেট জমা দিয়ে অনেকেই কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন। জাল সার্টিফিকেট চক্রের দৌরাত্ম্য এখন শুধু রাজধানীর নীলক্ষেতে সীমাবদ্ধ নেই, তাদের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়েছে সিউলসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে। জাল সার্টিফিকেট দিয়ে কোরিয়া নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে অনেকেই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ে কর্মরত আছেন।

গত দুদিন ধরে কোরিয়ায় বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এই নিয়ে চলছে তোলপাড়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বইছে আলোচনা-সমালোচনার ঝর। বিভিন্ন কমিউনিটি একে অপরকে দুষছে।

এইচআরডি কোরিয়ায় কর্মরত পদস্থ কর্মকর্তা শামসুল আলম তার ফেইসবুক আইডিতে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি লিখেন, শুনতে ভাল না লাগলেও, অপ্রিয় হলেও প্রয়োজন মনে করলে বলে ফেলাই আমার অভ্যাস। ভুয়া সার্টিফিকেট বানিয়ে আমাদের ই-৯ কর্মীদের ভিসা স্ট্যাটাস পরিবর্তন এবং কতিপয় লোকের ইউনিভার্সিটি শিক্ষার্থী হিসেবে কোরিয়া গমন কোরিয়াতে বাংলাদেশকে যে ইমেজ সঙ্কটে ফেলছে বা ফেলবে তা যে কারোরই বোঝার কথা। ঘটনা ঘটে গেলে তার বহুমাত্রিক প্রভাব পড়ে, তাই ঘটনা যাতে না ঘটে সেটাই আমাদের কাম্য হওয়া উচিত। এই ধরনের ইমেজ-সংকট সৃষ্টি প্রতিরোধকল্পেই যারা এসব কাজ করেছে তাদেরকে সতর্ক করেছিলাম, এতে কে কী মনে করলো তাতে আমার কিছু আসে যায় না। আশ্চর্যের ব্যপার হলো, এত কিছুর পরেও এখনও ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে আসে সত্যায়িত করে নেয়ার জন্য।

শুধু ভুয়া সার্টিফিকেট তৈরি নয় আনাড়ি হাতে ভুয়া ভিসা ফটোকপি তৈরির ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি এক মেয়ে তার বাসায় একটা খামের ভেতর তার কোরিয়ান ভিসা ফটোকপি, সিউলের কোনো এক ইউনির্ভার্সিটির এডমিশন লেটার (ফুলব্রাইট স্কলারশীপসহ ভর্তি ) ফটোকপি, কোনো এক এয়ার লাইন্সের কনফার্ম টিকেট রেখে বাসা থেকে উধাও। বাব মা মনে করলেন মেয়ে হয়ত কাউকে না জানিয়ে কোরিয়াতে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে গেছে। কিন্তু গত ১০দিনেও তার কোন ফোন বা খোঁজ না পেয়ে চিন্তিত হয়ে আমাদের কাছে আসা। ভিসা ফটোকপিটাতে চোখ পড়তেই অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়লো, সেজন্যই বললাম আনাড়ি হাতে তৈরি।

তার মানে বাদবাকি এডমিশন লেটার, এয়ার টিকেট সবই ভুয়া। যদিও এই মেয়েটি কোরিয়া যায়নি, কিন্তু ভুয়া ডকুমেন্ট তৈরি করা যে আমাদের জন্য পান্তা ভাত সেটা সে দেখিয়ে দিল। শেষ অবধি বোঝা গেল তিনি কোন এক জাতি ভাইয়ের জন্য দিওয়ানা, যিনি আমেরিকাতে ছাত্র হিসেবে আছেন, এদিকে পরিবার অন্য কারো সাথে জুটি বেধে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এখন কী আর করা….মজনুর জন্য যা যা করার তাই করলো লায়লী। ঢাকাকে সিউল বানিয়ে ছাড়ল…

একুশে/ওএফএইচ/এটি