চট্টগ্রাম: রংপুর থেকে ২৮ আগস্ট আনা হয়েছিল ‘নভ’কে। ‘নোভা’র পাশের কক্ষে রাখা হয় তাকে। পাশাপাশি কক্ষে রাখায় দুটির মধ্যে বেশ ভাবও হয়। বুধবার সকালে বর্ণাঢ্য আয়োজনে ধুমধামের মধ্য দিয়ে বিয়ে হলো তাদের। বুধবার সকাল ১১টায় সিংহের খাঁচায় মাংস-কেক কেটে এবং বেলুন উড়িয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার আলোচিত এই ‘নভ’ অর ‘নোভা’ হচ্ছে দুই সিংহ ও সিংহী।
বিয়ে উপলক্ষে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ফটক, ওয়াকওয়ে ও পশুপাখির খাঁচা রংবেরঙের বেলুন, ফেস্টুন ও জরি দিয়ে সাজানো হয়। ফেস্টুনে প্রেম ও বিয়ে-সংক্রান্ত নানা ছড়া ও গানের লাইন। আবার একটি ফেস্টুনে লেখা, ‘বোন বর্ষা চলে যাওয়ায় নোভার খুব মন খারাপ’। আরেকটি ফেস্টুনে লেখা ছিল ‘লীলাবালি’ নামের বিয়ের একটি গান।
বিয়েতে কাটা হয়েছে ৪৭ কেজি মাংসের একটি ‘কেক’; ভালোবাসার প্রতীকে সাজানো হয় মাংস-কেকটি। এতে ছিল প্রচুর গরুর কলিজা, ফুসফুস, হৃদপিন্ড, মাংস, দুটি আস্ত মুরগিসহ সিংহের প্রিয় সব পদ। বিয়ের অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের রীতি অনুযায়ী ঘাটা ধরে (বিয়ের গেট ধরে) ৩ হাজার ১ টাকা পেয়েছেন চট্টগ্রামের তিন নারী সাংবাদিক লতিফা রুনা, শাহেদা পিয়া ও শামীমা শীলা।
অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেছে, সিংহ ও সিংহীর পাশাপাশি খাঁচা দুটিকে বিয়ের সাজে সাজানো হয়েছে। একসময় ছোট খাঁচা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় সিংহটিকে। বড় খাঁচায় গিয়ে পাশের খাঁচায় থাকা নোভার দিকে ছুটে যায় সিংগটি। কিন্তু ‘ভয়ে’ নোভা দূরে সরে যায়।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার কিউরেটর চৌধুরী মোঃ মনজুর মোরশেদ বলেন, রংপুর থেকে পুরুষ সিংহটিকে চট্টগ্রামে আনা হয়। বিনিময়ে চট্টগ্রামের সিংহী বর্ষাকে রংপুর চিড়িয়াখানায় দেওয়া হয়। এখন দুজনের বিয়ের ব্যবস্থা করা হলো। ভবিষ্যতে বংশবৃদ্ধির আশায় এ ব্যবস্থা করা হয়েছে। সিংহ ও সিংহীকে ২৪ ঘন্টা পর এক খাঁচায় দেওয়া হবে। তবে আজ (বুধবার) এখানে অনেক মানুষ এবং ক্যামেরা দেখে এই দুটি প্রাণী একটু গরগর করছিল।
ব্যতিক্রমী এই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসকের স্ত্রী ইশরাত জাহান, অতিরিক্ত জেলা প্র্রশাসক (সার্বিক) ড. অনুপম সাহা, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুর রশিদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) হাবিবুর রহমান, জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলমাস শিমুল, কবি অভীক ওসমান ও সেলিনা শেলী, চিড়িয়াখানার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ রুহুল আমীন, ডেপুটি কিউরেটর চৌধুরী মোঃ মনজুর মোরশেদ, প্রাণী চিকিৎসক শাহাদাত হোসেন শুভ প্রমুখ।
এদিকে বিয়ের দাওয়াতে পেয়ে চিড়িয়াখানায় যান বন্দর মহিলা স্কুল এন্ড কলেজের শতাধিক ছাত্রী। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক আর চিড়িয়াখানা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতরাও বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন।
সিংহ-সিংহীর বিয়ের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় বুধবার অন্য দিনের তুলনায় দর্শনার্থী ছিল বেশি। সকাল ১০টা থেকে ১২টার মধ্যে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৮০০ টিকেট। এর বাইরে শতাধিক তিন বছরের কম বয়সী শিশু ছিল বিনাটিকেটের দর্শক।
এর আগে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, চট্টগ্রামে এত দিন সিংহী ছিল দুটি। রংপুর চিড়িয়াখানার সঙ্গে একেিট বদল করে এখানে সিংহ নিয়ে এসেছি। যাতে তারা প্রজননের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করতে পারে। একই সঙ্গে দেশবাসীকে প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসার বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় বাঘ নেই। তবে দুটি বাঘ আনার জন্য ইতিমধ্যে আমরা টেন্ডার প্রক্রিয়া করেছি। ৩৪ লাখ টাকা ব্যয় হবে। আশা করছি দু-এক মাসের মধ্যে বাঘ চলে আসবে। মৌলভীবাজার থেকে উল্লুকসহ দুর্লভ প্রজাতির কিছু প্রাণী আনা হবে।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার শুরুর আগে জিপিএইচ ইস্পাতের সৌজন্যে নির্মিত চিড়িয়াখানার নতুন ফটক উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫ সালের ১৬ জুন চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় জন্ম নেয় সিংহ শাবক ‘বর্ষা’ ও ‘নোভা’। দুই বোনের জন্মের কিছুদিন পর তাদের মা ‘লক্ষ্মী’ এবং ২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাবা ‘রাজ’ মারা যায়। এরপর আর কোনো নতুন সিংহ চিড়িয়াখানায় আনা হয়নি। একই সঙ্গে চিড়িয়াখানায় আর কোনো পুরুষ সিংহ না থাকায় ‘বর্ষা’ ও ‘নোভা’ কুমারী থেকে যায়। সম্প্রতি রংপুর চিড়িয়াখানায় দুটি পুরুষ সিংহ থাকার খবর পায় চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। এরপর বর্ষাকে রংপুর চিড়িয়াখানার সঙ্গে ‘অদলবদল’ করে বাদশাকে (নভ) চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়।
